ER/Press Release: 2026/02/68
কলকাতা, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ :
দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় রেলের যাত্রীরা এক প্রকার ‘ডিজিটাল যাযাবর’ হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন; একগুচ্ছ অ্যাপের গোলকধাঁধায় তাঁদের ক্লান্তির সীমা ছিল না। দূরপাল্লার ট্রেনের বার্থ সংরক্ষণের জন্য একটি অ্যাপ, শহরতলির লোকাল ট্রেনের জন্য অন্য একটি, আর ট্রেন ট্র্যাকিংয়ের জন্য হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন আরও একটি মাধ্যম। যাত্রার মূল ঝক্কি শুরু হওয়ার আগেই চলত আর এক ডিজিটাল যুদ্ধ—একাধিক পাসওয়ার্ড এবং বারবার লগ-ইন করার এক বিশৃঙ্খল সংগ্রাম।এখন সেই ডিজিটাল ক্লান্তি ও ঝক্কির চাকা অবশেষে থমকে গেল।
‘রেল-ওয়ান’ (RailOne)-এর আত্মপ্রকাশ
এটি এমন এক ‘সুপার অ্যাপ’, যা ভারতীয় রেলের বিশাল এবং অনেক সময় জটিল এই বাস্তুতন্ত্রকে একটি মাত্র মসৃণ ইন্টারফেসে নিয়ে আসার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ‘বন্দে ভারত’-এর উচ্চগতির আকাঙ্ক্ষাকে পাথেয় করে, ‘রেল-ওয়ান’ স্মার্টফোনকে বিরক্তির উৎস থেকে যাত্রীর শ্রেষ্ঠ ডিজিটাল সহচরে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
একীভূত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র
‘রেল-ওয়ান’-এর মুন্সিয়ানা লুকিয়ে আছে এর ‘এক-এর শক্তি’ (Power of One) দর্শনে। সংরক্ষিত বার্থের জন্য ‘আইআরসিটিসি রেল কানেক্ট’ (IRCTC Rail Connect) আর লোকাল ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে ‘ইউটিএস-অন-মোবাইল’ (UTSonMobile) নিয়ে জাগলিং করার দিন এবার শেষ। এই নতুন প্ল্যাটফর্ম দুটিকেই একীভূত করেছে, যার ফলে রাজধানী এক্সপ্রেসের তৎকাল টিকিট থেকে শুরু করে সাধারণ প্ল্যাটফর্ম টিকিট কিংবা মাসিক সিজন টিকিট (MST)—সবই এখন মাত্র কয়েকটা ট্যাপের মাধ্যমেই বুক করা সম্ভব।
নিরাপত্তা এবং অ্যাক্সেসের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। তৎকাল বুকিংয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যাত্রীদের যাতে ‘পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়ার’ বিড়ম্বনায় পড়তে না হয়, তার জন্য ‘রেল-ওয়ান’ নিয়ে এসেছে ‘লেগাসি লগ-ইন’ (Legacy Login) সুবিধা। এর মাধ্যমে আইআরসিটিসি বা ইউটিএস-এর বর্তমান ব্যবহারকারীরা সরাসরি তাঁদের পুরনো পরিচয়পত্র (Credentials) ব্যবহার করতে পারবেন। একবার লগ-ইন করার পর, ৬-অঙ্কের mPIN বা বায়োমেট্রিক ফেস আইডি (Face ID) নিশ্চিত করবে যে ব্যবহারকারী তাঁর গন্তব্যসূচি থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড দূরে রয়েছেন।
চলন্ত পথে বুদ্ধিমত্তা
শুধুমাত্র টিকিট বুকিং নয়, এই অ্যাপটি একাধারে রিয়েল-টাইম কনসিয়ার্জ বা ডিজিটাল পরিচারক হিসেবেও কাজ করবে। এর সমন্বিত ‘লাইভ ট্রেন স্ট্যাটাস’ এবং ‘পিএনআর ট্র্যাকার’ ট্রেনের বিলম্ব সংক্রান্ত সূক্ষ্ম তথ্য প্রদান করবে। অন্যদিকে, ‘কোচ পজিশন ফাইন্ডার’ প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের সেই চিরপরিচিত ছোটাছুটির অবসান ঘটাবে, কারণ এটি আগেভাগেই জানিয়ে দেবে ট্রেনের কোন কামরা ঠিক কোথায় এসে থামবে।
যাঁরা ভ্রমণের পাশাপাশি ভোজনবিলাস প্রিয়, তাঁদের জন্য রয়েছে ‘ই-ক্যাটারিং’ (E-Catering) সুবিধা, যার মাধ্যমে সরাসরি সিটেই খাবার পৌঁছে যাবে। এছাড়া, ‘রেল মদত’ (Rail Madad)-এর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে যে, চিকিৎসাগত সহায়তা বা পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত অভিযোগগুলো আর আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় আটকে থাকবে না; বরং সরাসরি রেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যাবে।
রেলওয়ের ডিজিটাল উত্তরণ
নগদহীন অর্থনীতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে রেলওয়ে ‘আর-ওয়ালেট’ (R-Wallet)-এর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। এটি যে কেবল এক-ট্যাপে পেমেন্ট বা লেনদেন সহজতর করবে তাই নয়, বরং ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দিতে অসংরক্ষিত টিকিটের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ ছাড় বা ক্যাশব্যাকের সুবিধাও প্রদান করবে—যা সাধারণ নিত্যযাত্রীদের জন্য পকেট-সাশ্রয়ী। রেল-ওয়ান কেবল একটি অ্যাপ নয়; এটি ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে এক বিরাট বড় পদক্ষেপ।
রেলওয়ে যখন এই সংযুক্ত যুগের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট: পথ ও রেললাইন হয়তো একই আছে, কিন্তু যাত্রাপথ এবার হয়ে উঠল অভাবনীয়ভাবে আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও সাবলীল।
