আবক্ষ মূর্তিতে পূজিতা হন দীগনগর ‘রায়’ পরিবারের দেবী দুর্গা

শুভম ঘোষ: পূর্ব বর্ধমান:- 

দশভুজা মা দুর্গা কৈলাস থেকে এল/ কার্তিক, গণেশ, সরস্বতী, লক্ষী সাথে… মণ্ডপে মণ্ডপে দশভুজা মা দুর্গার যে মূর্তি দেখতে বাঙালি   অভ্যস্ত আউশগ্রামের দীগনগরের ‘রায়’ বাড়িতে মায়ের সেই প্রচলিত মূর্তি দেখা যায়না। এখানে মায়ের সঙ্গে তার সন্তানরা আসেন না। পরিবর্তে এখানে মায়ের দু’পাশে আছেন তার দুই সখী জয়া ও বিজয়া। চিরাচরিত দশভুজা ও পূর্ণাবয়বের পরিবর্তে মায়ের মূর্তি এখানে আবক্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মূর্তির পিছনে লুকিয়ে আছে এক পৌরাণিক কাহিনী। 

 ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে পুরুষদের অবধ্য হয়ে উঠেছেন মহিষাসুর। সব কিছু ধ্বংস করতে করতে মহিষাসুর স্বর্গের দিকে অগ্রসর হন। তাকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে দেবতারা স্বর্গ ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ব্রহ্মা সহ সকল দেবতাদের স্মরণাপন্ন হন। সমস্ত দেবতার দেহ থেকে এক ঐশ্বরিক আলো বেরিয়ে এসে দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সহ সকল দেবতা অস্ত্র দিয়ে দেবী দুর্গাকে সাজিয়ে তোলেন। শুরু হয় দুর্গা ও মহিষাসুরের মধ্যে ন’দিন ধরে ভয়ংকর যুদ্ধ। কেঁপে ওঠে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল। ওদিকে দেবীকে বিভ্রান্ত করার জন্য ক্ষণে ক্ষণে মহিষাসুর নানান রূপ ধারণ করতে থাকে, নেয় ছলাকলার আশ্রয়। বাধ্য হয়ে দেবীও নেন ছলনার আশ্রয়। হস্ত-পদ হীন আবক্ষ মূর্তি ধারণ করে মৃতবৎ পড়ে থাকেন। মহিষাসুর দেবীর এই ছলনা বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে দেবীর পক্ষে তখন মহিষাসুরকে বধ করতে সুবিধা হয়। যুদ্ধের সময় দেবীর দুই সখী জয়া-বিজয়া পাশে ছিলেন। তাই এখানে সন্তানদের পরিবর্তে দুই সখী মায়ের সঙ্গে থাকেন।

জিতাষ্টমী অর্থাৎ আশ্বিন মাসের কৃষ্ণাষ্টমী তিথিতে মায়ের মূর্তি তৈরি করা শুরু হয়। দশমীর দিন ঘট বিসর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের আবক্ষ মূর্তি বিসর্জন করা হয় এবং তার পরিবর্তে অন্য মূর্তি রেখে সন্ধ্যায় সেটি বিসর্জন করা হয়। এর পেছনেও আছে আর এক অলৌকিক কাহিনী। 

ঘট বিসর্জনের সময় কোনো এক ঋষি দেখেন যে মণ্ডপের বেদিতে মায়ের মূর্তি নাই, মা কোথাও চলে গেছেন। বিস্মিত হন তিনি। ঋষির পরামর্শে তারপর থেকেই মায়ের নতুন মূর্তি স্থাপনের রীতি চলে আসছে। মায়ের পুজোর বাকি রীতি একই থেকে গেছে, কোনো পরিবর্তন নাই। তবে ‘রায়’ বাড়ির ব্যক্তিগত পুজো হলেও সমগ্র গ্রামবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। এইভাবেই কয়েক শতাব্দী ধরে দেবী দুর্গা এখানে পূজিতা হয়ে আসছেন। মায়ের এই মূর্তিতেই এলাকাবাসী খুব খুশি। মায়ের এই অপরূপ মূর্তি দেখার জন্য আশেপাশের মানুষ এখানে ছুটে আসেন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *