রিমা ঘোষ:- দুর্গাপুজোর একটি অংশ হলো ‘কুমারী পুজো’ – নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের প্রতীক। ১ থেকে ১৬ বছর বয়সী ঋতুমতী হয়নি, অনেকের মতে ২ থেকে ১০ বছর, এমন কুমারী মেয়েদের এই পুজো করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নারী জাতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাকে তুলে ধরা এবং নারীদের দেবী রূপে আরাধনা করা। ব্রাহ্মণ কুমারী কন্যার পুজো সর্বত্র প্রচলিত হলেও কুমারী পুজোয় কোন জাতি, ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই। মূলত মহাষ্টমী বা নবমী তিথিতে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। বেলুড় মঠের স্বামীজীরা কুমারী পুজোর প্রচলন করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশন মঠগুলিতে এর প্রচলন দেখা যায়।
ঋগ্বেদের দেবী সূক্তে, ত্রৈতেরীয় আরণ্যক, বিভিন্ন পুরাণ এবং মহাভারতের ভীষ্ম ও বিরাট পর্বে কুমারী পুজোর কথা আছে৷
এছাড়া কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো ও অন্নপূর্ণা পুজো উপলক্ষ্যে কুমারী পুজোর প্রচলন আছে। যদিও বর্তমানে কুমারী পূজার প্রচলন কমে গেছে।
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, একসময় বানাসুর বা কোলাসুর স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করলে বিপন্ন দেবতারা মহাকালীর শরণাপন্ন হন। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেবী মানবকন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়।
অন্য একটি কাহিনী অনুসারে রাম-রাবণের যুদ্ধের সময় রাবণ বধের জন্য দেবতারা ব্রহ্মার কাছে আসেন। তিনি দেবতাদের দেবী আদ্যাশক্তির স্তব করতে বলেন৷ দেবী আর্বিভূতা হয়ে দেবতাদের মর্ত্যে এক বেলগাছতলায় বোধন করতে পরামর্শ দেন৷ ব্রহ্মা দেখেন বেলগাছের পাতায় একটি শিশুকন্যা নিদ্রিত আছেন৷ ব্রহ্মার পরামর্শে দেবতারা সেই শিশুকন্যার পুজো করে তাকে তুষ্ট করে এবং রাবণ বধের বর লাভ করেন। তারপর থেকেই দুর্গাপুজোর সময় ‘কুমারী পুজো’-র প্রচলন শুরু হয়৷

‘কুমারী পুজো’র দার্শনিক তত্ত্ব হিসাবে বলা হয়, নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন হয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির প্রভাবে নিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় সাধিত হচ্ছে সেই ত্রিশক্তি বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। তাই কুমারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়। এই ভাবনায় ভাবিত হয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করেছিলেন।
সরলতা, ভালোবাসা, নিরহঙ্কার ও মানবতার প্রতীক কুমারীতে ভগবতী ভাব বেশি প্রকাশিত।তাই প্রতিমার বদলে চেতন কুমারীতে চৈতন্যময় ঈশ্বরের উপাসনা করে জগন্মাতাকে আমরা নিজের করে নিই। তাইতো রামকৃষ্ণ নিজের স্ত্রীকে ষোড়শী রূপে, স্বামী বিবেকানন্দ মুসলীম কন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করেছিলেনন৷ বিবেকানন্দের চোখে সব কুমারীই দেবীর এক একটি রূপ।
সুতরাং ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নম নমহ’ অনুসরণে
আমরা সবাই বলি – “মা তুমি ত্রৈলোক্যসুন্দরী, কিন্তু তুমি আজ সুভাগা রূপে আমার সম্মুখে উপস্থিত ৷ তুমি জ্ঞানরূপিনী, হাস্যময়ী ও মঙ্গলদায়িনী ৷”