চিত্তরঞ্জনে ভারতীয় ভাষার উৎসব, সাঁওতালি সংস্কৃতির উষ্ণ আলিঙ্গন

কৌশিক মুখার্জী: চিত্তরঞ্জন:-

কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, চিত্তরঞ্জনের প্রাঙ্গণে ১ জুন ২০২৫ তারিখে সাত দিনব্যাপী ভারতীয় ভাষা গ্রীষ্ম শিবির ২০২৫ উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে। সাঁওতাল পরগণার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির উষ্ণতায় মোড়া এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উৎসাহী অংশগ্রহণে এই দিনটি একটি স্মরণীয় সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সাঁওতালি ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটে এক হৃদয়গ্রাহী স্বাগত পর্বের মাধ্যমে। ছাত্র-ছাত্রীরা সাঁওতালি পোশাকে সজ্জিত হয়ে অতিথিদের “জোহার” শব্দে অভিবাদন জানায়, যা এই অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের শ্রদ্ধার প্রতীক। তুমডাক ও তমাক বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছনায় সাঁওতালি নৃত্যে দর্শকদের মুগ্ধ করা হয় এবং হাতে তৈরি মালা ও তিলক পরিয়ে অতিথিদের আন্তরিক আতিথেয়তা প্রদান করা হয়। পৈটকার শৈলীর শিল্পকর্ম এবং ওল চিকি লিপির ব্যানারে সুসজ্জিত অনুষ্ঠানস্থল সাঁওতালি সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলেছিল।
কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষা শ্রীমতী টেক ধর্নি শিবিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তাঁর বক্তৃতায় তিনি ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সাঁওতালি ভাষার মতো আদিবাসী ভাষাগুলোর সংরক্ষণ ও প্রচারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তিনি বলেন, এই শিবির কেবল ভাষা শিক্ষার মাধ্যম নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বীজ বপনের একটি উৎসব। প্রধান অতিথি শ্রী শঙ্কর শর্মা, টিটিভি/সিএলডব্লিউ-এর অধ্যক্ষ এবং বিশেষ অতিথি স্থানীয় সাঁওতালি সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞ শেক্সপিয়র সোরেনের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে। একদল ছাত্র-ছাত্রী সাঁওতালি ঐতিহ্যবাহী স্বাগত গান গেয়ে দর্শকদের মন জয় করে। একজন ছাত্র সাঁওতালি ভাষায় নিজের পরিচয় দিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা প্রদান করে, যা শিবিরের ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাঁচটি ভারতীয় ভাষায়, যার মধ্যে সাঁওতালি অন্যতম, অভিবাদনমূলক কবিতা আবৃত্তি করে ছাত্র-ছাত্রীরা দর্শকদের উচ্ছ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়। শিবিরের সমন্বয়কারী শিক্ষক সাত দিনের কর্মসূচির একটি সুন্দর রূপরেখা উপস্থাপন করেন, যার মধ্যে রয়েছে সাঁওতালি ভাষা শিক্ষা, ঐতিহ্যবাহী খেলা, রান্না, গল্প বলা, হস্তশিল্প এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে শ্রীমতী ভারতী দেবী ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় বিশেষজ্ঞ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অক্লান্ত সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি জীবনমুখী অভিজ্ঞতা, যা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলবে। এই উৎসবমুখর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ভারতীয় ভাষা গ্রীষ্ম শিবির ২০২৫-এর জন্য একটি উজ্জ্বল সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আগামী ছয় দিনে ছাত্র-ছাত্রীরা ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে, যা ভারতের সমৃদ্ধ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *