দরদাম

মৌসুমী মন্ডল (কলকাতা)

  দরদাম করার ব্যাপারে আমার বোন সম্পার জুড়ি মেলা ভার।ওর সাথে কেনাকাটা করতে গেলে ওর দরদাম করার ঠেলায় লজ্জায় আমার মুখ লাল হয়ে ওঠে আর ও শেষে বিজয়িনীর হাসি হাসে।

  দিন কয়েক আগে সম্পা আর আমি বেহালায় গিয়েছিলাম  daily use এর জন্য কয়েকটা কুর্তি কিনতে। এক জায়গায় হ্যাঙ্গারে টাঙানো বেশ অনেকগুলো কুর্তির মধ্যে হলুদ রঙের একটা কুর্তি আমার খুব পছন্দ হল। দাম জিজ্ঞাসা করতে দোকানদার বললো "বারোশ"। দামটা একটু বেশিই মনে হল আমার। খুব বেশি হলে সাতশো /সাড়ে সাতশো হলে ঠিক হত।

   দাম শুনে বোন কুর্তি টাকে চোখ দিয়ে ভালো করে জরিপ করে আমাকে ফিসফিস করে বলল..."দিদি শোন...তুই দোকানদারের সাথে দাম নিয়ে একটা কথাও বলবি না।"

…আরে বলিস কি বুনি! দোকানদারের সাথে কথা না বললে কুর্তি টা নেব কি করে?

সম্পা চোখের ইশারায় বললো…তোর মত হাঁদা কথা বললে এক পয়সাও দাম কমাবে না।তুই জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।
বোনের অদ্ভুত যুক্তি শুনে অগত্যা আমি ভ্যাবলার মত এক পাশে দাঁড়ালাম।

তারপর সে কুর্তিটা হাতে নিয়ে বললো….”কত দেব ঠিক করে বলুন তো দাদাভাই”
…বারোশ।
…কানে কালা নই। ওই দাম শুনেছি। জানতে চাইছি কত তে চলবে।
আমি একটু সরে দাঁড়িয়ে ওদের কথোপকথন শুনছি আর ভাবছি ,দেখা যাক সম্পার দাম কমানোর ক্রেডিট।

দোকানদার একটু ভেবে বললো…হাজার দিন।
সম্পা মুখ বেঁকিয়ে…পাঁচশোয় হবে?
দোকানদার ভ্রু কুঁচকে …পাগল নাকি! বারোশোর মাল পাঁচশো!নাগো হবে না দিদিভাই।

সম্পা…খুব হবে ।আপনি চাইলেই হবে।
দোকানদার…নাহ! বড়জোর আটশো পর্যন্ত নামতে পারি।
সম্পা…দেখুন পাঁচশোয় হলে দিন।না’হলে থাক।
দোকানদার…হবে না দিদি। আমার লাভ থাকবে না।
সম্পা…অ! তাহলে আর কি করা যাবে!
দোকানদার…এমন দাম বলুন, যাতে আপনিও কিনতে পারেন আর আমারও লোকসান না হয়।নিন সাড়ে সাতশো ফাইনাল।
সম্পা…না দাদা ওই পাঁচশোতে হলে দিন।
দোকানদার…আচ্ছা ঠিকাছে। আপনি সাত’শো দ্যান। আপনার কথাও রইলো, আমারও রইলো।
সম্পা…না দাদা পারবো না।পাঁচশোয় দিলে নেব, নইলে থাক। বলে কুর্তিটা উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলো।
দোকানদার…হবে না দিদি। এত কমে হয় ! আমার কেনা দামই আটশো। আমি কি লস করে দেব নাকি!
সম্পা…হয় হয়…উদাস ভাবে বললো।
দোকানদার…আমার কেনা দাম ই উঠবে না।
সম্পা…তাহলে থাক। বলে কুর্তিটা রেখে দিল।

সম্পার কানে কানে বললাম,”আরে যা দাম কমালো, তাতেই নিয়ে নিই না।”
সম্পা আমাকে চোখের ইশারা করে দোকান থেকে চলে যাওয়ার ভান করলো।
একটু এগোতেই দোকানদার ডাকলো…ও দিদিভাই কি হল চলে যাচ্ছেন যে !
কুর্তিটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। এই হতচ্ছাড়া বোনের দরদামের ঠেলায় নেওয়া হল না।মনটা খারাপ হয়ে গেল।
যাই হোক,সম্পা দু পা এগোতেই আমিও তার সাথে এগোলাম ব্যাজার মুখে। এই জন্য দরদাম আমার পোষায় না। খুব বেশি হলে দশ কুড়ি টাকা কমানো যায়।
আমরা খুব ধীর গতিতে তিন চার পা এগিয়েছি, এমন সময় দোকানদার ডাক দিল…ও দিদিভাই নিয়ে যান। আর পঞ্চাশ টা টাকা দেবেন।
সম্পা…না ওই এক দাম পাঁচশো।
দোকানদার……আর কি বলবো! বউনির সময়!নিন আর কি!
সম্পা মুচকি হেসে আমার হাতে চাপ দিল।
আমি তো মনে মনে হেসে ভাবছি “আরিব্বাস !”
আর আমার বুনি!
পাঁচশো টাকা বের করে যেন কুর্তিটা নেওয়ার তেমন একটা ইচ্ছা নেই, নেহাত দোকানদার অত করে ডাকলো বলে নিচ্ছে, এমন ভাবে প্যাকেটটা হাতে নিল।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *