“বালিকা হতে বধূ”

মৌসুমী মন্ডল (কলকাতা)

      গল্পের নাম শুনেই কি একটু খাবারের সুগন্ধ নাকে আসছে বন্ধুদের? ??ভাবছো বুঝি এক রন্ধনবিদ্যায় পারদর্শী নারীর গপ্পো করবো তোমাদের সাথে!!তোমাদের সুবিধার্থে  বলে রাখি এই গল্পের নায়িকা স্বয়ং আমি।

   আমার মা বাবা আমাকে খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন। তরকারিতে কি ফোড়ন দিতে হয় বা এক কাপ চা করতে  ক'চামচ চা পাতা দিতে হয় সেটাও জানতাম না।

  কি জানি ওই সময় বোধহয় মা বাবার কাছে আমি কন্যাদায়গ্রস্থ বোঝা ছিলাম ! নাকি অন্য কিছু জানতাম না ! 

তখন এত আজকের মত প্রতিবাদের চল ছিল না, আর আমি প্রতিবাদ করলেও ওই সময় শুনবে টা কে!

 ইদানিং কয়েক বছর যাবৎ ফেসবুকে  লেখালেখি করি, নিজের জীবনের কথা শেয়ার করি, তোমরা অনেকেই ভালোবেসে  আমার লেখাগুলো পড়।

তখন আমার সদ্য বিয়ে হয়েছে। বরের সাথে পাড়ি দিয়েছি পুরুলিয়ার একটি মফস্বল শহরে।ছোটোবেলার থেকেই আমি শান্তশিষ্ঠ ছিলাম।পড়াশুনার মধ্যেই ডুবে থাকতাম।

  বিয়ের পর একটা  স্বপ্ন দিয়ে মোড়া, আদর দিয়ে ঘেরা পৃথিবী থেকে ধাঁ করে মাটিতে এসে পড়লাম। দেখলাম, বরটা লোক খারাপ না, বেশ কেয়ারিং টাইপের।

   এবার আস্তে আস্তে ভালো বউ হয়ে ওঠার চেষ্টা শুরু করলাম। প্রথমেই বরের কাছে কাঁদোকাঁদো হয়ে স্বীকার করলাম, রান্না বান্নায় আমি অষ্টরম্ভা, আমি রান্না তো দূর চা বানাতেও জানিনা।

 লোকটা অবশ্য বেশ সাহস দিয়ে বলল,"কুছ পরোয়া নেহি, আমি তোমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেব।"

  বরের ইন্সট্রাকশন মেনে আর কিছুটা কল্পনার রং মিশিয়ে মানে এই মশলা সেই মশলা মিশিয়ে দু'একটা পদ রেঁধেও ফেললাম। নতুন বউকে ইমপ্রেস করার জন্য বরটাও বাহ! বাহ! বলে উৎসাহিত করত। কিন্তু চুপিচুপি তোমাদের একটা কথা বলি, আমি নিজের রান্না নিজেই মুখে তুলতে পারতাম না।

তখন মোবাইল তো অনেক দূর, ল্যান্ড ফোনও ছিল না। মা’র আদেশ, উপদেশ সমেত সপ্তাহে দু’একটা চিঠি ভরসা।

   ইতিমধ্যে বেশ কটা মাস অতিক্রান্ত হয়ছে!প্রতিটা চিঠিতে মার কাছ থেকে অথবা প্রতিবেশী দিদিভাইদের কাছ থেকে কোন তরকারিতে কি ফোড়ন দিতে হবে, কিভাবে  কষতে হবে এসব জেনে নিতাম।

তখন গ্যাস ছিল না।ষ্টোভে রান্না করতাম। ফিতে পড়ে গেলে সেটা ঠিক করতে নাকানিচোবোনি খেতাম। একদিন বর খাসির মাংস এনেছে। আমি মনের সুখে বেশ লাল লাল ঝোল করার জন্য সাত-আট চামচ লংকা গুঁড়ো মিশিয়েছি। ঝালের চোটে সেই মাংস মুখে দেওয়া গেলনা। অত দামের মাংস!ফেলে তো আর দেয়া যায় না।বাটিতে জল নিয়ে ধুয়ে ধুয়ে মাংস খেলাম। আরেকদিন মাছ ভাজতে গিয়ে তেল ছিটে গোটা হাতে বড় বড় ফোস্কা পড়ে গেল।ভয়ে আমি দু’দিন আর রান্নাবান্না করলাম না।

এক শ্রাবণ দিনে সকাল থেকে প্রচন্ড বৃষ্টি।খিচুড়ি আর বেগুনি খাওয়ার সাধ হয়েছে। হাঁড়ি ভর্তি করে জল দিয়ে খিচুড়ি বসিয়েছি। দু’ঘন্টা ফুটেও খিচুড়ির জল আর কমে না!বেগুনি পুড়ে কালো! চোখ ফেটে জল এল ! খিচুড়ি আমি এত ভালোবাসি কি বলবো! বাটি তে ঢেলে খিচুড়ি আর কালো কালো বেগুনি খেলাম।

  ও আরেকটা কথা বলতে  ভুলে গেছি। তখন আমার চোখে চশমা ছিলনা। মাছ ভাজার সময় যদি চোখে তেল ছেটে! বরের একটা পুরানো সানগ্লাস পরে মাছ  ভাজতাম। বেশিরভাগ দিনই ভাজার সময় মাছ ভেঙে যেত।

  তাও লড়ে গেছি !!অখাদ্য হোক,কুখাদ্য হোক অকুতোভয় চিত্তে রেঁধে  গেছি।

এই করে মাস তিনেক অতিক্রান্ত। ততদিনে  একটা কনফিডেন্স পেয়ে গেছি। আমার মধ্যে বেশ একটা সুগৃহিনী সুগৃহিনী ভাব এসেছে ।

 বাজারে কুকমী, সানরাইজের বিভিন্ন রেডিমেড মশলা কিনতে পাওয়া যায়। নিজের কল্পনা শক্তি দিয়ে একটা মশলার সাথে অন্য মশলার সমন্বয় ঘটিয়ে নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত রান্না শুরু করেছি।

অখাদ্য কুখাদ্য যেমনই হোক মহা উৎসাহে একটা একটা পদ রাধতাম। আর ভাবতাম না জানি কতই না সুন্দর খেতে হবে!! এখন ভাবি আমার ভালো মানুষ বর কত না কষ্ট করে খেত।

   দু'চার মাস পর পর বাবা মেয়ে-জামাইকে দেখতে যেতেন। বাবা তো আমার রান্না খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মা কে বলতেন,"আমার মামনীর মত রান্না তুমিও পারো না।" আমারও গর্বে ছাতি ৫৮ ইঞ্চি হয়ে যেত।

   শ্বশুরবাড়ি গেলে শাশুড়ি মা ওনার ছেলেমানুষ বৌমা কে রান্নাঘরে খুব একটা ঢুকতে দিতেন না। আর আমিও কত বড় রন্ধন পটিয়সী হয়েছি দেখানোর জন্য জেদ করতে থাকতাম।তখন উনি হয়তো একটা কিছু করার অনুমতি দিতেন। 

 শ্বশুর মশাইকে শাশুড়ি মা বলতেন, আজ এটা বৌমা রান্না করেছে। শ্বশুর মশাই খুব আগ্রহ ভরে খেয়ে প্রশংসা করতেন। অথচ আমি নিজে মুখে দিয়ে দেখতাম হয় পুরো নুনে পোড়া, নয়তো হলুদের গন্ধ।

 একদিন আমি  এক্সপেরিমেন্টাল  একটা দারুন রান্না করে মহা উৎসাহে বরকে টেস্ট করতে দিলাম। বর একটু মুখে দিয়ে বললো,এটা কি ?

আমি বেশ বড়ো গলায় বললাম, পটলটা সামান্য তেলে ভেজে, কাঁচা আম, কাঁচকলা, সজনে ডাঁটা, চিংড়ি মাছ, বেশি করে পিঁয়াজ, রসুন, মিট:মশলা আর কী কী সব যেন  মিশিয়ে  রান্না করেছি, ঘি গরম মসলা মিশিয়ে নামিয়েছি।এতে প্রবলেম কোথায়?

 ব্যাস, বাটি টা ছুঁড়ে ফেলে অমন শান্ত মানুষটা গাঁক গাঁক করে চেঁচিয়ে বলল, আমার রান্না নাকি অসহ্য! ওই সব ছাইপাশ খেতে খেতে নাকি ওনার অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসে। কাল থেকে যদি আমি এইসব এক্সপেরিমেন্টাল রান্না করি, উনি হোটেলে খাবেন। বরকে এহেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতে দেখে আমি তো পুরো থ! ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম।

তারপর আমি আমার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলাম। হাপুস নয়নে কাঁদতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আমার কান্না দেখে ওনার রাগ গলে জল হয়ে গেল।

  এই করেই ছত্রিশ বছর কেটে গেল। প্রায় দিনই রান্নায় লবন বেশি হয়ে যায়,হলুদ বা মশলা বেশি হয়ে তরকারি তিতকুটে হয়ে যায়।

  ভালো মানুষ বর যা রান্না করি,সোনামুখ করে খেয়ে নেয়। কেমন হয়েছে জিগ্যেস করলে কোনো উত্তর দেয়না। নুন বেশি হলে জল ঢেলে নেয়, নুন কম হলে একটু নুন মিশিয়ে নেয়। মুখে কিছু বলেনা।

কেন কে জানে!

 দুঃখের বিষয় আমি আজও “রন্ধন পটিয়সী” হয়ে উঠতে পারলামনা। কিন্তু হাল ছাড়িনি, চেষ্টার ত্রুটিও রাখিনি।

   একদিন নিশ্চই পারবো। শতবার ছেড়ে সহস্র বার চেষ্টা চালিয়ে যাবো। "রন্ধন পটিয়সী" আমাকে হতেই হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *