শ্রাবণী মুখার্জী (লালবাজার, বাঁকুড়া)

বৈঠকখানায় সোফাতে বসে পাঁচুগোপাল একমনে খবরের কাগজে কলম দিয়ে কি যেন আঁকছে আর ইয়া ইয়া করে একবার করে আওয়াজ ছাড়ছে। নিজের মনেই মৃদু হেসে যেন নিজেকেই সাবাসি দিচ্ছে।
সকাল বেলা দু বালতি কাপড় কাচার পর শিপ্রা খুব ক্লান্ত, এখনো জলখাবার বানানো হয় নি, আজ যে কি বানাবে তাই ভাবতে ভাবতে বৈঠকখানায় সোফাতে বসতে যাবে
ঠিক সেই সময়ই _
পাঁচুগোপাল_ সহাস্যে মুখ ভরিয়ে বললো গিন্নী এসেছো খুব ভালো হয়েছে, এবার গরম গরম বেশ কড়া করে দু কাপ চা বানাও দেখি নি, আঃ বেশ জমে যাবে বুঝলে ?
শিপ্রা _ একে ক্লান্ত তারপর জলখাবারের চিন্তা মাথায় ঘুরছে, তারপর দুপুরের রান্না বান্না, সব মিলিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ঝেঁজকারে উঠলো। বলি তোমার মতলব টা কি শুনি? সকাল থেকেই খবরের কাগজে মুখ গুঁজে, তারপর খাবারের থালায় মুখ গুঁজে তারপর বালিশে মুখ গুজে তারপর বন্ধুদের আড্ডায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকো সারাদিন। বলি তোমার কি সংসার করার ইচ্ছা নাই ? রোজগারের জন্য অফিসটুকু যেতে হয় তাই যাও নৈলে তো তোমার জুড়ি মেলা ভার।
পাঁচুগোপাল _ আঃ গিন্নী! তুমি খামোকা চিন্তা করছ, ফুরফুরে মেজাজে থাক, তাইলে দেখবে পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সুষ্ঠু সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
শিপ্রা _ আঃ মরণ! আমি মরছি সংসারের চিন্তায় আর উনি আছেন… যত্তসব ।
পাঁচুগোপাল _ কই দাও বেশ কড়া করে দু কাপ চা দাও দেখিনি। জানো আজকের শব্দছকে বেশ দারুণ সমাধান করতে পারছি আর কয়েকটা মাত্র বাকি আছে একটু চা খেলেই ওগুলো সমাধান করতে পারব তাইলেই আমি বিজেতা হব বুঝলে ?
শিপ্রা _ হ, তুমি বিজেতা হলে কি দেশের প্রথিতযশা প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবে ?
পাঁচু গোপাল _ আরে ধুর ছাই, প্রধানমন্ত্রী হতে চাই না আমি, আমি তো ফুরফুরে মেজাজে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরতে চাই, বাঁচতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর চাপ জানো? না না আমি ওসব এতো চাপ নিতে পারব না।
শিপ্রা _ হ , সে তো বটেই। সব চাপ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে পিঠ চাপড়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ ।
পাঁচু গোপাল _ আঃ গিন্নী, তুমি না কোথাকার জল কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছ। আরে আমি তো সংসার ধর্ম পালন করছি মন দিয়ে । তুমি দেখছো না? কত্ত যত্ন করি তোমার, শাড়ি, ব্লাউজ, টিপ, কাজল এমনকি কলপ এনে দিই তোমার জন্যে। সেগুলো বুঝি কিছু না ? তুমি হলে গিয়ে সংসারের জননী। মা হয়ে আগলে রাখে আমাদেরকে, তুমিই পারো বটে সব…
শিপ্রা _ ( কাঁদতে কাঁদতে) কি বল্লে আমি তোমার মা ? জননী? হে ঈশ্বর, এ কার হাতে তুলে দিলে আমাকে? স্ত্রী কে মা ভাবছে? হা পোড়া কপাল আমার। ছি ছি ছি!
পাঁচু গোপাল _ মুখটা হাঁ করে চেয়ে রইল, তারপর আমতা আমতা করে বলল, উঁহু গিন্নী কাঁদ না
তুমি কিছুই জানো না দেখছি। শুনো তোমাকে একটা সত্যি ঘটনা বলছি। শুন বলি,
কামারপুকুরে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব জন্মেছিলেন জানো নিশ্চয়ই। ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এর পুত্র হয়ে গদাধর চট্টোপাধ্যায় শিশুকাল থেকেই আত্মভোলা ।
তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন জয়রামবাটির সুকন্যা সারদা দেবীর সাথে। আহা অপূর্ব সুন্দরী বালিকা। বধু হয়ে যখন ঘরে এলো সারদা দেবী কে তিনি সিংহাসনে বসিয়ে মাতৃজ্ঞানে পুজো করলেন। ভাবতে পারো গিন্নী? তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্কের অবনতি তো হয় নি। এমনকি সারদা মা আজীবন সধবা হয়ে জগতের রাজমাতা হয়েছেন। সেই বিখ্যাত মানুষ সবার ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব হলেন আর সারদা সবার মা হয়ে উঠলেন। একি কম প্রাপ্তি ? বলো গিন্নী বলো । না.. তুমি দেখছি কিছুই জানো না। ভাবের ঘরে বসে এসব তথ্য কথা শুনতে হয়, জানতে হয় বুঝলে গিন্নী। জানো আমাদের ঠাকুর -সারদা দেবীর কোনো অসুবিধা হতে দেন নি গো। আর সারদা দেবীও ঠাকুরের জন্য গরম গরম ফুলকো ফু..ল..কো লুচি ভেজে খাওয়াতেন, গরম গরম চা করে দিতেন, গরম গরম পোকো..ড়া…
শিপ্রা _ থাক থাক হয়েছে, আর বলতে হবে না। অনেক বলেছো। এবার আমি বলছি তুমি শুনো।
ইচ্ছামতী দেবীর কৃপায় বর লাভ করে একদিন রাতের বেলা বসুন্ধরার সংসারে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখে স্বামী স্ত্রী হয়ে গেছে আর স্ত্রী স্বামী হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আমাদের এই বৈঠকখানাতেও ইচ্ছামতী মায়ের কৃপা লাভ হয়েছে।
পাঁচু গোপাল _ চোখ ইয়া বড় করে তাকিয়ে বললো মানে??
শিপ্রা _ খবরের কাগজ টা হাতে নিয়ে পেন দিয়ে ঠুকছে আর বলছে, একটু চা বানিয়ে আনো তো প্রাণেশ্বরী।