সুজান মিঠি (জামালপুর, পূর্ব বর্ধমান)

কেন ডাকছো মাগো!
জানো না, সব দুর্গা ফেরে না?
আঁচলে শিউলি কুড়িয়ে বারান্দায় উঠতেই সকালের চায়ের দেরিতে কুসুমের গালে পড়লো
থাপ্পড়…
শিউলি বাসি হয়ে কুঁকড়ে যাওয়ার আগেই বছর কুড়ির সদ্য বিবাহিতা কুসুম শব হয়ে গেল অভিমানে
বলো মা, ও কি ফিরবে আর?
শারদ প্রাতে রোদ্দুর মেখে খিলখিল করে হেসে উঠবে?
রতন বাউলকে দেখতে পেলেই বলবে, কাশের রঙে গান বাঁধো না বাউল কাকা!
বলবে না মা। ফিরবেও না।
জানো না মা, সব দুর্গা ফেরে না?
দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে মেয়ে।
সেখানে সে বাসন মাজতে মাজতেও আকাশ দেখে।
চাঁদ দেখে। সূর্য দেখে।
মনে মনে ঢাকের শব্দ শোনে।
মেঘ করলেই তাতে চিঠি পাঠায়…
মাকে বোলো মেঘ, এর পরের পুজোয় নিশ্চয়ই আমি বাড়ি যাবো!
ও কী বা করবে? তাকে পাঁচ বছরেরটি রেখে বাবা মরেছে।
মাও অন্যের বাড়িতে কাপড় কাচতে কাচতে
অসুখ বাঁধালো,
এই মেয়ের মাথায় এখন সংসার।
দয়ালু এক বাবু নিয়ে গেল তার বাচ্চা দেখাশোনা করবে বলে
সাথে টুকটাক বাসন মাজবে, ঘরদোর ঝাঁট দেবে
আর…
আর সে ফিরবে না
টাকা আসে। তাতে বাঁচে তার মায়ের অসুখ, বোনের দুধ , ভাইয়ের ভাত…
সে আসে না।
জানো না মা, সব দুর্গা ফেরে না?
এই দেখো না, সদ্যজাত কন্যাটিকে তার ডিম্বদাত্রী গর্ভধারিণী মা নিজেই রেখে গেল ডাস্টবিনে…
সে কোন্ আনন্দে ফিরবে বলো তো?
কেনই বা ফিরবে?
তার চেয়ে ঘৃণায় লজ্জায় ধিক্কারে মৃত্যুতেই বরং ঘুমিয়ে থাকুক ও।
সব দুর্গা ফেরে নাকি গো মা?
সারারাত ধরে আমার শরীর নিয়ে খেলা করে
আমার হাত পা মুখ স্নায়ু আর আয়ুতে ধ্বংস এঁকে আমাকে পাঠিয়ে দিল ঠাণ্ডা ঘরে।
আমার রক্ত মাংস প্রাণ জমে বরফ হতে হতে
আমি হয়ে গেলাম নির্ভয়া
হয়ে গেলাম অভয়া
আরো হলাম
হলাম তিলোত্তমা…
তারপর?
তারপর কাশ ফুটলো
ঢাক বাজলো
নতুন জামা জুতোর গন্ধ বাতাসে
ফুরফুরে রোদ্দুর…
মুঠো মুঠো শিউলি আর তোমার কান্না…
আর কেঁদো না মা!
আর কেঁদো না!
ও মা, মাগো!
অমন করে আর ডেকো না আমায়!
জানো না, সব দুর্গা ফেরে না?
কক্ষনো আর ফেরে না!
কোনোদিনও ফেরে না…