রমেশ রায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা:- “ফিরছে ওরা ঘরে, হ্যামের হাত ধরে”—এই স্লোগানকে ফের একবার সার্থক করে তুলল ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাব (হ্যাম রেডিও) এবং সাগর থানার পুলিশ। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ভিড়ে পথ হারানো হরিয়ানার রজনী শর্মা বৃহস্পতিবার, অবশেষে তাঁর পরিবারের হাত ধরে বাড়ির পথে রওনা হলেন। এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন সাগর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অর্পণ নায়েক এবং হ্যাম রেডিও-র নিবেদিতপ্রাণ সদস্যরা।
গঙ্গাসাগরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া দিনলিপি
এ বছর গঙ্গাসাগর মেলায় পুণ্যস্নানের লক্ষে এসেছিলেন রজনী শর্মা। কিন্তু মেলার জনসমুদ্রে আচমকাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন পরিবার থেকে। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে দিন কাটছিল রাস্তার ধারে কিংবা দোকানের বারান্দায়। কখনও গান গেয়ে, কখনও নাচ করে আবার কখনও ডুকরে কেঁদে সময় পার করছিলেন তিনি। স্থানীয়দের দেওয়া খাবার খেয়েই কোনোমতে টিকে ছিলেন। গত কয়েকদিন আগে মাঘী পূর্ণিমার মেলা চলাকালীন কচুবেড়িয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বরত এক সিভিল ডিফেন্স কর্মীর নজরে আসেন। খবর দেওয়া হয় সাগর থানায়।
তদন্তে নামেন ওসি ও হ্যাম রেডিও খবর পাওয়া মাত্রই সাগর থানার ওসি অর্পণ নায়েক বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে হ্যাম রেডিও-র প্রতিনিধি দিবস মন্ডলকে জানান। হ্যাম রেডিও-র সদস্য শিক্ষক দিবস মন্ডল ও আতাউর সেখ রজনীর সাথে দফায় দফায় কথা বলেন। মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তিনি একেকবার একেক জায়গার নাম বলছিলেন। কখনও রাজস্থান, কখনও দিল্লি বা উত্তরাখণ্ড। দীর্ঘ আলাপের মাঝে তিনি একটি স্কুলের নাম ও প্রিন্সিপালের নাম উল্লেখ করেন। সেই সূত্র ধরেই হ্যাম রেডিওর সদস্যরা যোগাযোগ শুরু করেন। জানা যায়, রজনীর বাবা-মা ও ভাই কেউ জীবিত নেই। পাড়া-প্রতিবেশীরাও শুরুতে তাঁকে চিনতে পারছিলেন না। তবে হাল ছাড়েননি ওসি অর্পণ নায়েক ও হ্যাম রেডিওর সদস্যরা। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারের সুভাষগড়ে তাঁর বোন রিম্পি শর্মার খোঁজ মেলে। জানা যায়, রজনীর স্বামী রাজীব কুমার ও তাঁর সন্তানরা হরিয়ানার ফরিদাবাদে থাকেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। পরিবারের সাথে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেওয়া হলে তিনি আনন্দে নেচে ওঠেন এবং গান ধরেন— “তুম আগর সামনে আভি যায়া করো”। রজনীর স্বামী রাজীব কুমার শুরুতে তাঁকে ফিরিয়ে নিতে কিছুটা অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সাগর থানার পুলিশ ও হ্যাম রেডিও-র পক্ষ থেকে হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী দপ্তর এবং ফরিদাবাদ পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হয়। প্রশাসনের চাপে ও ওসি অর্পণ নায়েকের নিরন্তর সহযোগিতায় অবশেষে আজ রাজীব কুমার সাগরে পৌঁছান।
আজ বৃহস্পতিবার, সাগর থানার ওসি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে হ্যাম রেডিও-র সদস্যদের উপস্থিতিতে রজনী শর্মাকে তাঁর স্বামীর হাতে তুলে দেন। বিদায়বেলায় রজনীর মুখে ছিল অমলিন হাসি। সাগর থানার ওসি অর্পণ নায়েক জানান, “পুলিশ ও হ্যাম রেডিওর এই সমন্বিত প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। আমাদের আনন্দ এখানেই যে একজন মানুষকে আমরা নিরাপদে তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে পারলাম।”
ধন্যবাদ জানিয়েছেন সাগর থানার পুলিশ আধিকারিক, সিভিল ডিফেন্স ও হ্যাম রেডিও-র সদস্যরা। হ্যাম রেডিও-র বার্তা— “হ্যাম মানেই হেল্প অলওয়েজ ম্যানকাইন্ড।” রজনী আজ বাড়ি ফিরলেও সাগরের চরে হয়তো এখনও এমন অনেক মানুষ প্রিয়জনের অপেক্ষায় আছেন। তবে প্রশাসন ও হ্যামের এই মেলবন্ধন আশ্বাস দিচ্ছে—সবাই ফিরবে ঘরে।

Posted inজেলার আপডেট
