চিত্রা কুণ্ডু বারিক (কলকাতা)

সেদিন পথে আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে কানে ভেসে এলো কেউ যেন ডাকছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার চলতে শুরু করি। কারণ এই পথে চেনা মুখ বলতে কেউ নেই যে আমাকে ডাকবে। কিন্তু না এবার যেন খুব কাছে থেকে কানে এলো “এই স্বপ্না শুনতে পাচ্ছিস না কতক্ষণ ধরে ডেকে চলেছি।”
বুকটা ধড়াস করে ওঠে “কে ডাকে !” থেমে গিয়ে পিছন ফিরে তাকাই দেখি খুব চেনা চেনা লাগছে অথচ অচেনা।
“কিরে চিনতে পারছিস না ভুলে গেলি। আমি সেই শুভময় মনে পড়ছে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা চুলকে বললাম আরে… “কতবছর পর দেখা। কি করে চিনলি আমি সেই স্বপ্না। কিন্তু তুই কত্তো বুড়ো হয়ে গেছিস রে । চুলগুলো পেকে কি অবস্থা হয়েছে তোর ।”
“তুই বুঝি এখনও সেই কচিটি রয়েছিস।” আমার চুল টেনে বলে ওঠে।
“এই আমরা কিন্তু বড় হয়ে গেছি এখন , আগের মতো আর সেই দুষ্টুমি করা সাজে না আমাদের।” বলেই শুভময়ের পেটে গুম করে এক ঘুষি দিলাম।
” শুভময় বলে ওঠে এই তোর বড় হবার নমুনা…।”
“চল চল কোথাও চা খেতে খেতে একটু আড্ডা দিই। কিরে আমার জন্য কি একটু সময় পারবি দিতে? না শুধু কত্তা মশাই নিজের জন্য কেড়ে নিয়েছে তোকে।”
বললাম “ধ্যাত কিযে বলিস না। চল যাই তবে সন্ধ্যা হওয়ায় আগেই কিন্তু বাড়িতে ফিরতে হবে সেই বুঝে আড্ডা হবে কিন্তু।”
সেদিন শুভময়ের সাথে অনেক কথা হলো। ভীষণ ফাস্টেশনে ভুগছে। এখনও ব্যাচেলর মানুষ। একটা সময় সংসারের সব দায়িত্ব নিয়ে নিজের দিকে চেয়ে দেখেনি, ভাবেনি জীবনের একটা সঙ্গী ভীষণ দরকার ছিল। বড় ছেলে তার ওপর ভাই, বাবা, মা সবাইকে দেখা। বাবা মা দুজনেই অসুস্থ, ভাইয়ের পড়াশোনা। সবকিছু সঁপে দিয়ে আজ সে বড় অসহায়। ভাগ্যিস একটা সরকারী চাকরী পেয়েছে। ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে ভেবেছিল এবার একটু পরিত্রাণ পাবে, কিন্তু পরের বাড়ির মেয়ে আখেরে নিজেরটুকু বুঝে আলাদা হয়ে গেছে।
ইদানিং শুভময় একটু একাকী বোধ করে। গল্প করার সঙ্গী নেই। পাড়ায় তেমন আড্ডা নেই। নিজের হাতে রান্না করে। হাত পুড়ে গেলে কেউ বলে না “ইস্ ! সরো সরো আমি করে দিচ্ছি।” শরীর খারাপ লাগলে ওষুধ এনে দেবার কেউ নেই। তেষ্টা পেলে এগিয়ে গিয়ে জল দেবার জন্য হাত নেই।
বললাম “এই বয়সেও অনেকের ভালবাসা হয়, বিয়ে হয় দেখ না কেউ তো এমন আছে তারও হয়তো কেউ নেই। যে তোকে ছাড়া কিছুই জানবে না। দেখবি কত ভালো থাকবি। আর আমি তো আছিই তোর সেই ছোটবেলা বন্ধু হয়ে।”
চোখের কোনে জল জমতে থাকলো শুভময়ের। ওর মাথায় চুলগুলো ঝাকানাকা দিয়ে বললাম “দেখলি তো সেই দেরি করে দিলি। চল আজ উঠি রবিবার কোনো জায়গায় বেশ আয়েশ করে আড্ডা হবে কেমন। আর আমি সেদিন তোর জন্য নিজের হাতে রান্না করে নিয়ে আসবো। বল কি খাবি?”
মুচকি হাসি দিয়ে বলল “আমার আবার খাওয়ার স্বাদ, সে তো মা চলে যাওয়ার পর ভুলে গেছি। তুই যা খাওয়াবি খুব ভালোবেসে খাবো। কিন্তু না না তোকে রান্না করে আনতে হবে না দুজনে কোথাও কোনো রেস্তোরাঁয় খাবো আর আরও অনেক অনেক গল্পের আসর জমাবো।”
আসলে সেদিন আমার কোনো তাড়া ছিল না। শুভময়ের কষ্টটাকে বুঝতে পারছিলাম আর অনুভব করলাম মনে হলো সবাই আমরা এখন পড়ন্ত বিকেলে সূর্যাস্তের মুখে। দিন বয়ে গেল অথচ পিছনে তাকাইনি কখনো বা হয়তো সময় পাইনি। তাই সেদিন একরকম জোর করেই উঠে পড়লাম। জানা নেই শেষ জীবনে কি আছে। সূর্য ডুবতে বসেছে। এবার ফেরার পালা।