শিলিগুড়িতে দৃষ্টিহীন ক্রিকেটের রোমাঞ্চকর সমাপ্তি, চ্যাম্পিয়ন শিলিগুড়ি রাইজার্স

শিলিগুড়িতে দৃষ্টিহীন ক্রিকেটের রোমাঞ্চকর সমাপ্তি, চ্যাম্পিয়ন শিলিগুড়ি রাইজার্স


‘অল বেঙ্গল ভিশন–আই চ্যালেঞ্জার্স কাপ ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে ডুয়ার্স টেরাই সুপার ১১–কে হারিয়ে শিরোপা জয়

ভাস্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি:- টানটান উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহে সমাপ্ত হল রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় দৃষ্টিহীনদের টি–২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ‘অল বেঙ্গল ভিশন–আই চ্যালেঞ্জার্স কাপ ২০২৬’। সামাজিক তথা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উত্তরের দিশারীর উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় দক্ষিণবঙ্গ থেকে তিনটি এবং উত্তরবঙ্গ থেকে তিনটি দলকে নিয়ে তিনদিনব্যাপী চূড়ান্ত পর্যায়ের লড়াই অনুষ্ঠিত হয়।

১৩ মার্চ টুর্নামেন্টের প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শিলিগুড়ি রাইজার্স মুখোমুখি হয় দুর্গাপুর চ্যালেঞ্জার্স–এর। সেই ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে জয় ছিনিয়ে নেয় শিলিগুড়ি রাইজার্স।
পরদিন ১৪ মার্চ তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ম্যাচে সুন্দরবন টাইগার্স–এর বিরুদ্ধে জয় পায় দুর্গাপুর চ্যালেঞ্জার্স। দ্বিতীয় ম্যাচে দার্জিলিং রয়ালর্স মুখোমুখি হয় ডুয়ার্স টেরাই সুপার ১১–এর এবং সেখানে জয় তুলে নেয় দার্জিলিং রয়ালর্স। তৃতীয় ম্যাচে সুন্দরবন টাইগার্সের বিরুদ্ধে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়ে আবারও জয়ী হয় শিলিগুড়ি রাইজার্স। ১৫ মার্চ সকালে অনুষ্ঠিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কলকাতা ক্যাপিটাল মুখোমুখি হয় দার্জিলিং রয়ালর্স–এর এবং সেখানে জয় পায় কলকাতা ক্যাপিটাল। এরপর পয়েন্ট তালিকার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় গ্র্যান্ড ফাইনালের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী।

এদিন শহরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সূর্যনগর ময়দানে অনুষ্ঠিত গ্র্যান্ড ফাইনালে মুখোমুখি হয় শিলিগুড়ি রাইজার্স এবং ডুয়ার্স টেরাই সুপার ১১। টসে জিতে ডুয়ার্স টেরাই সুপার ১১ লড়াই শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ম্যাচে ১৩.৫ ওভারে ৫ উইকেটের বিনিময়ে ১১৪ রান করে জয় ছিনিয়ে নেয় শিলিগুড়ি রাইজার্স। এই জয়ের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের সাক্ষী থাকল শিলিগুড়ি শহর।

সংস্থার তরফে জানানো হয়, দৃষ্টিহীন ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়— বি১, বি২ এবং বি৩। এর মধ্যে বি১ ক্যাটেগরিতে থাকেন সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন খেলোয়াড়রা, বি২ ক্যাটেগরিতে আংশিক দৃষ্টিহীন এবং বি৩ ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত হন যাদের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়েছে। এই তিনটি ক্যাটেগরির খেলোয়াড়দের সমন্বয়েই প্রতিটি দল গঠন করা হয়।

ফাইনাল ম্যাচে শিলিগুড়ি রাইজার্সের হয়ে বি১ ক্যাটেগরিতে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হন ওম শাঁ, বি২ ক্যাটেগরিতে এই সম্মান পান বিজয় মান্না এবং বি৩ ক্যাটেগরিতে নির্বাচিত হন নাসিরউদ্দিন আহমেদ। এছাড়াও টুর্নামেন্টের সেরা ব্যাটসম্যান নির্বাচিত হন দিব্যেন্দু মাহাতো, সেরা বোলার হন আর্মেন জেস্, এবং সেরা ফিল্ডার হিসেবে সম্মানিত হন উকিল কিস্কু।

ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলের হাতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তুলে দেন শিলিগুড়ি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের মেয়র গৌতম দেব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রতুল চক্রবর্তী, সিএবিবি–র সিনিয়র প্রেসিডেন্ট বুসে গৌড়া, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট চিন্ময় মণ্ডল, শিলিগুড়ির ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর লক্ষ্মী পাল, শিলিগুড়ি ডি.পি.এস.সি–র চেয়ারম্যান দিলীপ কুমার রায়, উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র প্রফেসর ডাঃ সন্দীপ সেনগুপ্ত, শিলিগুড়ি গুরুদুয়ারার প্রতিনিধিদলসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।

এই প্রসঙ্গে উত্তরের দিশারী–র কার্যকরী সভাপতি সুজিত চ্যাটার্জী বলেন, “আমাদের সংস্থা সারা বছর জুড়ে নানা সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের আয়োজন করে থাকে। সংগঠনের মূল লক্ষ্য হল সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা। সেই ভাবনা থেকেই আমরা বিশেষভাবে সক্ষম ছাত্র–ছাত্রী, খেলোয়াড়, শিল্পী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করে চলেছি। দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের প্রতিভা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসকে সামনে তুলে ধরতেই এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই ধরনের উদ্যোগ তাঁদের সমাজের মূল স্রোতে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতেও এই ধরনের সামাজিক উদ্যোগ আমাদের সংস্থা অব্যাহত রাখবে।”

অন্যদিকে সংস্থার সভাপতি অনুপ দত্ত বলেন, “শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের ক্ষমতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ। আমরা চাই আগামী দিনে এই টুর্নামেন্ট আরও বড় পরিসরে আয়োজন করতে এবং রাজ্যের আরও বেশি দৃষ্টিহীন খেলোয়াড়কে এই মঞ্চে তুলে আনতে।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের সাহস, দক্ষতা এবং অদম্য মানসিক শক্তির প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে আয়োজন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *