অনীতা প্রামানিক (কলকাতা)

ধীরে ধীরে রাতের চাদর সরে গিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসে আলোর রশ্মি। শীতের কুয়াশা সরিয়ে মলিবাঁশের বেড়া ভেদ করে আলোকিত করে দোচালা খড়ের ঘর।মতি বৃথা সময় নস্ট না করে হন হনিয়ে রওনা দেয় পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সে দুপুরের আগে ফিরবে মাস্টুরের বাড়ির কাজ সেরে।ঘরে তার সমত্ত মেয়ে ফুলকি কে রেখে তিন মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে কাজে যায়।
ফুলকি মায়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকতো ।গায়ের ভীতর দিয়ে হেঁটে গেলে শহরের রাস্তা দূর হয় তাই মেঠোপথ ধরে যেত।পথের দুপাশ জুড়ে নিবিড় হয়েছে জঙ্গল মহুয়া কুসুম পলাশ বন, বাবুদের বাগান। কুয়াশা ভরা সকালে দুরন্ত হাওয়া দুলিয়ে যায়। এই সকাল কে সবাই ভয় করে মতি বাদে।ফুলকি বিস্ময় ভরা চোখ ঝুলে থাকে হাজার ও জিঞ্জাসা, মা তুমার শীত লাগেনি?শীত ভাবলে তু ভূখা মরবি। বাপ হারিয়ে গিলে পরে আছে দেখ কিনে। সারাদিন কাজ করেও সুখ পাইনে তোরে ভালো কিছু খাওয়াতে পারিনে।
মতির ফিরতে সূর্য পশ্চিমে ঢলে যায়। মতি রোজ জোর হাত করে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মাড়াঙ্গ গুরুর কাছে প্রার্থনা করে ফুলকির জন্য।এই অনিয়ম পথ চলা বুকে সদ্দি জমে বিকট ঘড় ঘড় শব্দ শ্রেষ্মার আর্তনাদ। আদিবাসী জীবন যাপন খুব দূর্বিষহ। কেরোসিনের অভাবে বাতি জ্বলে না। অনাহারী মায়ের দিকে তাকিয়ে বিস্ফারিত চোখের তারায় ভেসে ওঠে মৃত্যু। ভয়ে হাত পা কাঁপছে, শোকের ধ্বনি বয়ে আনে ওই কাক। চিকিৎসার অভাবে মতির বুকের হার খাচা ছিড়ে প্রান পাখি উড়ে গেল। ফুলকি উন্মাদিনী গলায় বুক চাপরে আর্তনাদ করে উঠল।
প্রতিবেশীরা খবর পেয়ে ছুটে এলো তার ঝুপড়িতে। সবাই চলে গেল দেহ সৎকার করার জন্য। সে মাকে শেষ বিদায় জানিয়ে রিক্ত নিঃস্ব বোবা। চোখ বেয়ে অবিশ্রান্ত ধারা নামলো জলের তার চোখে ঝাপসে উঠলো স্বপ্ন। ফুলকি অভাবের তাড়নায় মাস্টুরের বাড়িতে কাজে লাগলো। বিবাহিত মাস্টুরের সন্তান সম্ভব্য স্ত্রী মায়ের বাড়িতে।
সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। বিদ্যুৎ খেলে বেড়াছে। আঁধার নেমেছে পৃথিবীতে। সোমত্ত ফুলকি কে দেখে তার কামনায় হৃদয় ভরে উঠলো। অসহায় ফুলকির অন্নদাতা ছিলেন সুর্দশন মাস্টার। ফুলকির সমস্ত বাধা অতিক্রম করে মাস্টার। সেদিন অনেক আশ্বাস দিয়েছেন কিন্তু কোনো কথা বিশ্বাস করেনি ফুলকি। সে মুখের উপর জবাব দিয়ে কাজ ছেড়ে চলে আসে। মাস তিনেক পরে পাশের গাঁয়ে কালু সর্দার এর সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের সাত মাস পরে তার কোল আলো করে পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। আদিবাসী সম্প্রদায় তার সন্তান প্রসব করা মেনে নিতে পারেনি। আদিবাসী সন্তান এমন হতে পারেনা ।কার পাপ ঘরে ঢুকিয়েছিস? মুরুব্বি বিচার সভায় তার শাস্তি হলো গায়ে পোড়া সেঁক বেঁধে মার।সেদিনের অঘটন এই নিষ্পাপ মেয়েটি বুঝতে পারেনি এই পরিনতি পাবে ।সে বাবার ঘরে চলে আসে ফুটফুটে ছেলে হয়েছে শুনে পাড়ার মানুষ সবাই জুটেছে দেখতে। ঘরে খাবার নেই। সে সদ্য সন্তানকে পিঠে বেঁধে মাঠের কাজে যায়। সে আর মাস্টার সাথে দেখা করেনি। পরন্ত দুপুর গুটি গুটি পায়ে পাহাড় চূড়ায় লাল আভা রাঙিয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ফুল ঢেকেছে পথ। মাস্টারের সন্তান গর্ভে মারা যায়। শোকাহত স্ত্রীকে নিয়ে পাহাড়ের মুক্ত আবহাওয়া ঘুরতে এসে পথের বাঁকে ফুলকির সাথে দেখা হয়। মাস্টার হয়তো মনে প্রানে এই দেখা হওয়াটাই চেয়েছিল। নিষ্পাপ ফুলকি ছুটে আসে মাস্টারের কাছে এগিয়ে দেয় তার সন্তানকে। দেখ বাবু তুরমতন হয়েচে। বুদ্ধিমতী রিমি সদ্য সন্তান হারিয়ে সে অনুমান করেছিল কোথাও রহস্য লুকিয়ে আছে। দামাল দস্যি সন্তানকে তার পরিচয় ফিরিয়ে দিতে দুহাত বাড়িয়ে কোলে টেনে নেয়। ফুলকি পা ধরে মিনতি করে। দিদিমনি গো আমার বেটাকে পিয়ার দিস ইজ্জত দিস ও বড়ো দুখা আছে। ফুলকি আজ তৃপ্ত তার সন্তানকে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পেরে। সে দুরন্ত স্রোতে ভেসে মুহূর্তে ফিরে আসলো সাঁওতালি আখড়ায়।
