চিত্রা কুণ্ডু বারিক (কলকাতা)

সমীর কর্মক্ষেত্রে ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। কাজের সময় সে পৃথিবীর কাউকে চেনে না।
বছর দুয়েক হয়েছে তার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোথাও ঘুরতে যাওয়া বা বৌকে ( নীলিমা )একটু সময় দেওয়া ঠিক ভাবে হয়ে ওঠেনি।
নীলিমাও তেমন চাওয়া পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নিজের ইচ্ছে দমিয়ে সংসার সাজিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যায়। মুখ ফুটে স্বামীর কাছে কোনো দাবি রাখে কখনো। কিন্তু মনে মনে বান্ধবীদের দেখে একটু মন খারাপ হয়ে যায়। কখনো বিয়ের পর স্বামীর কাছে আবদার করে নি যে তার বান্ধবীর সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাবে। কিন্তু মনে মনে ভীষন ইচ্ছে হতো কিছুদিন একা একা কোথাও ঘুরতে যাওয়া। চুপচাপ বসে কোথাও নিজেকে চেনা।
ভালবাসা কি তা বিয়ের পর এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। সুখ ছিল কিন্তু মনে শান্তি ছিল না। একদিন হঠাৎ বলেই ফেলল সমীরের কাছে “হ্যাঁ গো তুমি তো কাজ ছাড়া কিছুই বোঝোনা। তা একটা দিন কি একটু কোথাও ঘুরে আসা যায় না? আমি ও তো এই বন্দি ঘরে হাঁপিয়ে উঠি।”
সমীর বলল বেশ তো একটা কাজ করো তুমি না হয় কদিন কোথাও ঘুরে এসো। যেখানে মন চায় যাও আমি খরচ দিয়ে দেবো। আসলে দেখো আমার চাকরিটাই এমন। জানি তোমার অনেক কষ্ট হয়।
নীলিমা তাতেই রাজি। বলল বেশ তো তুমি একটা কোনো জায়গায় হোটেল বুকিং করে গাড়ির টিকিট কেটে দাও আমি ঘুরে আসি। শেষমেষ তাই হলো। সাতদিনের জন্য একা একা কোথাও সময় কাটিয়ে আসবে।
বাঙালির কাছে কাছাকাছি জায়গা হলো দীঘা/ পুরি। দামি এবং সেফটি হোটেল বুকিং করে দিল সমীর যাতে কোনো প্রবলেম না হয় নীলিমার।
সেই দিনের সময় আসার অনেক আগেই নীলিমা ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফেলেছে। মনে একটা ফুরফুরে মেজাজ। তারপর দিন আসতেই সমীর গাড়ি বুক করে দেয় নীলিমা একাই চলে যায়।
পৌঁছে যায় দীঘার সুন্দর একটি হোটেলে। ভীষণ পছন্দ। ফোন করে সমীরকে জানিয়ে দেয় তার প্রথম অভিজ্ঞতা।
পাশের হোটেলে আর একটি পরিবার ওঠে। দুদিনের মধ্যে তাদের সঙ্গে খুব ভালো পরিচয় হয়। তার একদম মনে হয় নি যে সে একা এসেছে।
এক সন্ধ্যায় নীলিমা সমুদ্রের ধারে মৃদু মৃদু হাওয়া খেতে খেতে পায়চারি করছে। পরনে ছিল সাদা শাড়ি, স্লিভলেস ব্লাউজ। পয়ের চটিটা হাতে নিয়ে খালি পায়ে অনুভব করছিল আর গলায় ছিল গুনগুন করে গান। বেশ ভালো গলা। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিল এই সময়ে যদি একটিবার সমীর এসে আলতো করে ছুঁয়ে বলতো আমি এসেছি। হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে বলতো চলো হাঁটি সাথে শিথিল হাওয়া গায়ে এসে ফুঁ দিয়ে যাবে। হঠাৎ হালকা বৃষ্টি কোথা থেকে দুজনকে ভিজিয়ে হৃদয় ছুঁয়ে দেবে। কখন যে দুজনে আনমনা হয়ে হারিয়ে যাবো; দুটো মন কখন যে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতে আচমকা চমকে ওঠে মন। কিছু অনুভব করলো তার শরীর। চোখ বন্ধ হয়ে গেল। মনের ভেতর ধকধক করে ওঠে আনন্দে আর খুশীতে লাফ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় চিৎকার করে বলে উঠল যাক আমার মনের ইচ্ছে পূরণ হলো।
কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে গেল, আচমকা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে পরিস্থিতি। কারন যে ছোঁয়া অনুভূতি জেগেছিল তা সমীর নয় ছিল পাশের হোটেলে নতুন পরিচয়ের নিখিল। আস্তে করে বলে ওঠে বড় ভালবেসে ফেলেছি। তাই চুপচাপ তোমাকে লক্ষ্য করে এখানে চলে এলাম।
চলো না দুটো মন একাকার করে দিই। শুরু হোক নতুন যাত্রা।
নীলিমা ভীষণ রেগে যায় এবং এই নোংরা ভাষা সহ্য করতে না পেরে ঠাস করে সপাটে চড় বসিয়ে দিয়ে ছুটতে ছুটতে পৌঁছে যায় নিজের রুমে। ফোন করে সমীরকে জানায় একটু কি আমার জন্য সময় নেই তোমার বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। সমীর ভয় পেয়ে বারবার জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে তোমার খুলে বলো।
রাগে ক্ষোভে নীলিমা ফোন বন্ধ করে দেয়। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দরজায় কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙে কিন্তু ভয় পায় খুলতে। এদিকে ফোন বন্ধ তাই ফোন রিংটোন হবে না। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো এখন উপায় কি?
তারপর কানে আলতো করে ছুঁয়ে যায় মিষ্টি একটা শব্দ নীলিমা আমি তোমার সমীর দরজা খোলো।