ও---বাবুমশাই
মমতা শঙ্কর সিনহা পালধী (নিউ ব্যারাকপুর, উত্তর চব্বিশ পরগণা)

ও----বাবুমশাই---ও---বাবুমশইরা---শুনছেন--- শুনছেন---শুনতে কি পাচ্ছেন আপনারা---আমি সেই নারী বলছি--- আমি সেই নারী---যে মহান বিধাতার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব মনুষ্য জাতীর মনুষ্যত্বের অসামান্য রূপ---নারী----
যার থেকে সৃষ্ট এ সমাজ সভ্যতা-----
সেই নারী বলছি আমার অন্তরদহনের ইতিহাস---
চিৎকার করে আপনাদের সকলের সামনে বলতে চাইছি আমার সম্ভ্রমের,আমার নারীত্বের অবমাননার ইতিহাসের কথা----বাবুমশাইরা-----শুনতে কি পাচ্ছেন আমার কন্ঠস্বর!!!!
ওঃওঃ!!কি অসহ্য---কি অসহ্য সে অবমাননার ইতিহাস---যা হয়তো গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের শরসহ্যায় মৃত্যু যন্ত্রনার থেকেও অতি ভীষম------!!!
ত্রেতা----দাপর----থেকে এই কলি----সব যুগেই শিক্ষিতা,যুদ্ধবিদ্যা,নৃত্য-গীত বিদ্যা সহ---
সর্বগুণা সম্পূর্ণা নারী হয়েও আমি হয়েছি চরম অবমাননার শিকার---।।
ত্রেতায় জনক দুহিতা আমি জানকী----অযোধ্যার অধিপতি রামচন্দ্রের প্রিয়তমা পত্নী সীতা---চৌদ্দ বছর বনবাসকালে লঙ্কারাজ রাবণের হাতে বন্দনী হয়ে রাম-রাবনের যুদ্ধ শেষে লঙ্কাধিপতীর স্বর্ণলঙ্কার অশোক বনের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে চৌদ্দ বছরের বনবাসের অবসানে সরযূ নদীর তীরে অযোধ্যা নগরীতে রামচন্দ্রের সাথে সগৌরবে ফিরে আসলেও-----আমি জনক দুহিতা জানকী---পৃথিবীর কন্যা জানকী---রাজেন্দ্রানী সীতা----আমাকে সতীত্বের পরীক্ষার জন্য দিতে হয়েছিল অগ্নিপরীক্ষা-----
হ্যাঁ---- হ্যাঁ ---- হ্যাঁ----বাবুমশাই----বাবুমশাইরা----আমাকে সেদিন দিতে হয়েছিল অগ্নিপরীক্ষা------!!!!
কারণ---কারণ---আমি যে নারী----
আমার স্বামী----রামচন্দ্র সেদিন তাঁর প্রজাবৎসল্যতা রক্ষার জন্য আমার----তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় জানকীর সতীত্বের উপর আস্থা রাখতে পারেন নি-----
তাই তো আমি সেদিন দ্বিধাবিভক্ষ ধরিত্রী মায়ের বুকে নিজ সম্ভ্রম রক্ষার তরে হয়েছিলাম সমাহিতা।।
হায় রে সমাজ----সেদিনও বোঝেনি----তার পরবর্তি কালে----সেকালে---
কি ঘটেছিল বাবুমশাইরা----শুনুন---শুনুন আমার সেই----কাহিনী----শুনুন আপনারা সকলে শুনুন---
ধর্ম পুত্তুর যুধিষ্ঠির----সহ পঞ্চপাণ্ডব যখন মহাভারতে কৌরবদের কাছে পাশাখেলায়---মামা শকুনীর কথার ছলনায় পাঞ্চালীকে বাজী রাখলেন---আর সে ভরা সভাস্থলে পাশাখেলার হারস্বরূপ পাঞ্চালীররূপী আমার বস্ত্র হরণের মধ্য দিয়ে নারীত্বের হলো চরম উপহাস----তখন বোধ হয় বিধাতার চোখও অশ্রুসিক্ত হয়েছিল---
বাবুমশাই---ও বাবুমশাইরা শুনুন সেই সময় গোটা সমাজের মহাভারতের এক নবরূপ রচিত হয়েছিল-----যার নাম""কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গণ""।
বাবুমশাই----শুনছেন বাবুমশাইরা---আমি সেই নারী---
যার জয়গান----গদ্য,সাহিত্য----
উপন্যাস---কবিতা--গানে---
নাটকে----
পৌরাণিক ইতিহাস থেকে কবিগুরু----বিদ্রোহী কবি নজরুল----কবি জীবনানন্দ---থেকে আধুনিক কবি,লেখক,উপন্যাসিক সকলের লেখনীতে আমি----অসামান্য, বীরঙ্গনা---কতো না রূপে আপনাদের সকলের মনের রঙ্গমঞ্চের দৃশ্যপটে আবির্ভূতা হয়েছি---তাই না----তাই তো---
হ্যাঁ---হ্যাঁ---হ্যাঁ---বাবুমশাইরা----
আমিই সেই নারী----সতী,বেহুলা,অহল্যা---
অপলা,গার্গী,মৈত্রী,বিশ্ববরা---
ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই---থেকে---প্রেমিকের হাত ধরে ঘরছাড়া নারী----যে দেখেছিল সুন্দর এক বৈবাহিক সংসার জীবনের স্বপ্ন---সেই পতিতা---"গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'" ইচ্ছা বিরুদ্ধ পতিতা জীবন।।
আমি সেই নারী---বাবুমশাইরা---যে রবীন্দ্র সাহিত্যের বীরঙ্গনা রাজনন্দনী চিত্রাঙ্গদা---আবার সন্তান স্নেহের বিরহে কাতর মহাভারতের পান্ডব জননী কুন্তী,,,
যিনি কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গণে যুদ্ধের প্রাক্কালে কুমারী মায়ের অসম্মান ঘোচাতে জন্ম মূহুর্তে নিজ পুত্র কর্ণকে নদীর জলে বিসর্জন দিয়েছিলেন---সেদিন গোধূলিবেলায় পূর্ণ জাহ্নবী তীরে মাতৃত্বের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হাজির হয়েছিলেন পুত্র কর্ণের সামনে।।
বাবুমশাই---ও বাবুমশাইরা---শুনতে কি পাচ্ছেন আমার কন্ঠস্বর---
আমি সেই নারী---যে কখনো মেধা পাটেকর---কখনো কল্পনা চাওয়লা---
আমি সেই নারী---যাকে আপনারা রোজ দেখেন---ট্রামে,বাসে,অফিসে-
আদলতে---নিজের বাড়িতে---কখন মা,স্ত্রী,কন্যা,প্রেমিকা---আরও কত না কত কি রূপে।।
আমি সেই নারী বাবুমশাই----যে কবির কল্পনায় কখনো কৃষ্ণকলি,জীবনানন্দের নাটরের বনলতা সেন---
কখনো কোন প্রত্যন্ত গ্রামের সামান্য নারী---যাকে আপনি---আপনি---হ্যাঁ---হ্যাঁ---হ্যাঁ----আপনারা---যারা নারীর সম্মান হনন করেন তারা রাতের আঁধারে সুসজ্জিত বিছানায় রাজকীয় লাম্পট্যে আমাকে পাইক বরকন্দাজ পাঠিয়ে অর্থের প্রলোভন দিয়ে দরিদ্র পরিবার থেকে তুলে আনেন নিজ কাম চরিতার্থ করতে।।
আমি সেই নারী----বাবুমশাই---আমি সেই নারী----যে পরিবারের যোয়াল টানতে পরিবারের সকল দায় নিজের কাঁধে তুলে নিই নির্দিধায়,,,,
আমি সেই নারী---যাকে সাহিত্যে,শাস্ত্রে,লোকাচারে---
আপনি--আপনি---আপনারা সকলে মা বলে পূজা করেন।।
হ্যাঁ---হ্যাঁ---হ্যাঁ---বাবুমশাইরা--- আমিই সেই নারী----গ্রামের আলপথ ধরে ফসলের আঁটি বয়ে আনি---ঘর বাঁধি সুখের,,,
আমি সেই নারী----সমাজের সব হলাহল পান করতে রাতের আঁধারে সুসজ্জিত হয়ে ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়াই খদ্দেরের অপেক্ষায়-----আমাদের আঙিনার মাটিতে গড়ে ওঠে দেবী দুর্গার মূর্তি,,
আমি সেই নারী---‐যে দেবী কালীকার রূপ----
যে এগিয়ে চলে কালচক্রের হাত ধরে---
বীভৎস দাবানল হয়ে এগিয়ে যাই আমি----
ধ্বংস হয়----উন্মত্ত ব্যাভীচারের দেহ----
সভ্যতার আধুনিকতার নগ্নতার দেহ-----
উন্নয়ন,প্রগতিশীল অন্তরসার শূন্য সমাজ সভ্যতার কঙ্কালসার দেহ-----
