সুমিতা সিনহা (দুর্গাপুর)

ভরা ভাদরের বেলা। কদিন ধরেই অঝোর ধারায় ঝরেই চলেছে। সেই সঙ্গে শোঁ শোঁ তেজে পাগলা ঝোড়ো হাওয়া। বিরামহীন জলের ধারা নেমেই আসছে। ভিজে চুলের ঢাল বিছিয়ে গোমড়া মুখো আকাশটা ভারী হয়ে আছে চারিধারে। যার ফলস্বরূপ ইছামতী এখন ভরা পোয়াতির রুপ ধারণ করেছে। কখন যে প্রসব বেদনা জানান দেয় বোঝা মুশকিল।
ভাঙ্গা টালির চুঁইয়ে পড়া জলে ঘর ভেসে চলেছে। নেত্যটা আপন মনে খেলা করছে। খেলতে খেলতে বারংবার বার মুখো হয়ে যায়। বংশী তাকিয়ে থাকে। ইচ্ছে করে না আর টেনে আনতে। ওই টুকু ছেলেটার কি দোষ? অমৃতের স্বাদ পেয়েছে যেখানে সেখান থেকে ফেরানো কি আর সম্ভব! লক্ষী চলে যাবার পর সকলেই বলতে লাগল ‘ওটা মা তো লয় পাষাণী! একবারও যাবার আগে ভাবলো না ওইটুকুন ছেলের কুথা।’এক পাগল করা ভয় পাতকুয়ার আঁধারের মতো গিলে খেতে আসে বংশীকে। ছেলেটার কাছে আরও একটুখানি ঘেঁষে বসে। বৃষ্টির ঝাঁপটায় মাটির মেঝে জলকাদায় পিচ্ছিল। কতবার মনে হয়েছে ঘাস মারা বিষের বোতলটাই গলায় ঢেলে সব জ্বালা শেষ দিতে। পরক্ষণেই নেত্যটার মুখের দিকে তাকালে বুকটা হুহু করে কেঁপে ওঠে। ঘর থেকে বেরোতে মন চায় না। গাঁয়ের বাকি মরদগুলান হাসাহাসি করে। ‘কেমন পুরুষ মানুষ রে তুই! ঘরের বউকে আগলে রাখতে পারিস নে! নিজের বউ পালিয়ে যায় পরপুরুষের সাথে!’
ফি বছর চৌমাথার মোড়ে বুড়ো শিবতলায় গাজন উৎসব বসে। চত্তির মাসের শেষের দিকে এই গাজন নিয়ে হইহই পড়ে যায়। আশেপাশের গাঁয়ের মানুষ এমনকী ইছামতীর ওই পাড়ের মানুষজনও ভিড় করে আসে। রীতিমতো মেলা বসে যায়। মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় দুই পাড়। ঝাঁকড়া বটগাছটার নীচে তেরপল টাঙিয়ে যাত্রাপালা বসে। দুই পাড়ের খেটে খাওয়া মরদ গুলাই পালা দেয়। মেয়েদের এখানে কোনো বালাই নেই। বংশীও পালায় নাম লিখিয়েছে। শিবঠাকুর সাজে। তামাটে সুঠাম শরীরে ছাইভস্ম মেখে, কোমরে বাঘছাল গলায় রুদ্রাক্ষের মালা দিয়ে, হাতে ত্রিশূল নিয়ে যখন মঞ্চে উঠে। সেই সময় হারমোনিয়াম খোল করতাল আর তবলার সঙ্গতে আকাশ বাতাসে কান পাত দায় …..গেল বছরই ওইপাড়ের গাজনদলের বাজানদার রাসুদলুই এর সাথে লক্ষী ঘর ছাড়ল।
এবারও তিনদিনের গাজন শেষে সকলেই ফেরার পথ ধরলেও বোশেখের ঠাঁ ঠাঁ দুপুরে বুড়ো শিবতলায় রোগা পিংলে চেহারা খানা নিয়ে পড়ে রইলো পাগলী। ঘর কুথা জানতে চাইলে ছুটে গিয়েছে ইছামতীর পাড়ে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। নাম বলে সুবোনী! বোঝবার উপায় নেই হিঁদু ঘরের না মুসলিম। সোমত্ত মেয়েমানুষ একলা পড়ে থাকে মন্দিরের এক কোণে। পুরুত ঠাকুর বলে,’এমন ধারা ম্যাইয়া মানুষ দেকিনি বাপু! কত করে কইলাম ঘরে ফিইরা যাও বুড়া শিবের দয়ায় সব ঠিক হইবো। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আসলে মানুষের কখন কোথায় যে আঘাত লাগে কেউ তা কইতে পারে না। সহ্যি করার খেমতাও তো কারও থাকে না।’ এ হেন নেত্যর নিত্য দিনের খেলার সাথী এই পাগলী। বংশী ও পরম নিশ্চিতে মন্দিরের সেবায় লেগে থাকে।
বৃষ্টি একটু ধরেছে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বংশী। নেত্যকে একপাশে বসিয়ে রেখে মন্দিরের চাতাল পরিস্কার করছিল একমনে। হঠাৎই কান্নার শব্দে পিছন ফিরে দেখে খেলতে খেলতে পিচ্ছিল চাতাল থেকে পড়ে গিয়েছে। বংশী নেমে এসে তোলার আগেই সুবোনী ছুটে এসে কোলে তুলে নিয়ে নিজের স্তন মুখে গুঁজে দিলো। নিমেষেই নেত্যর কান্না বন্ধ।
আবারও ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। চারদিকে ঝাপসা হয়ে যাওয়া অথৈ দুপুরে ছলছল চোখে চেয়ে থাকে বংশী। কাঁধের উপর হাত রেখে পুরুতঠাকুর বলে,” ওরা ভালোবাসার কাঙালরে! নিয়ে যা ঘরে। মানুষটাকেও বাঁচা! তুই নিজেও বাঁচ আর নেত্যটাও বাঁচুক!
কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না বংশী। শুধু তাকিয়ে দেখে ইছামতীর প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে। এবার হয়তো নদীর নারী রূপের পূর্ণতা প্রকাশ পাবে।।
