শ্রী র জ ত (কলকাতা)

এক অদ্ভূত আলো ছায়া ময় জীবনের ক্যানভাসে নিজেই চিত্র হয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম চিত্রকর হবো। ছবি আঁকবো – বেদনার অপূর্ব সমাহারে আনন্দের প্রবাহমানতা নিয়ে। কিন্তু জীবন এতটাই আনপ্রেডিক্টেবল, এতটাই ফার্স্ট যে নিজেই রঙ মেখে ভুত সেজে চিত্র হয়ে চোখ জুলু জুলু করে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছি। সেই দেখা গুলো আবার কেবল মাত্র দেখাই হয়ে রয়ে যাচ্ছে। জমাট বেঁধে দানা দানা আঁখের গুড়ের মত কল্পনা বুঝি হারিয়েই গেলো।
যখন বয়েস কুড়ি পেরিয়ে একুশ- বোঝার চেষ্টা করেছিলাম সময়ের গ্যাপিং টা। একাকি অন্ধকার শ্মশানে চিতার শেষ আলোটুকুর দিকে তাকিয়ে অনুভব করেছিলাম জীবন কি। হঠাৎ শুনলাম হট্টগোল। শ্মশান যাত্রী দের মধ্যে বেদম মারপিট পরোটা ঘুগনি নিয়ে। চীৎকার করে যে মেয়েরা কাঁদছিলো- দেখি কিনা কাপড় সেঁটে একে অপরের দিকে তেড়ে যাচ্ছে।
আমার আর চিতার শেষ উত্তাপ নেওয়া হলোনা। পালিয়ে গেলাম।
যখন বয়েস ত্রিশ পেরিয়ে একত্রিশ – মনটা ভীষণ উদাস হয়ে গিয়েছিলো। ছাত্র থেকে যুবক, যুবক থেকে লোক। গুটি গুটি পায়ে এগোচ্ছি অনিবার্য সেই গন্তব্যের দিকে।
এই সময় কালে একটা ব্যপার লক্ষ করলাম। যারা আমায় ডাক নামে ডাকতো- তারা টুপ টাপ ঝরে যাচ্ছে। প্রাচীন সব মানুষ। প্রাচীন সব গাছের মত। এই গ্রাম, এই শহর- তাদের কে দাপিয়ে চলতে দেখতাম। হঠাৎ করে সব এক এক করে চলে যাচ্ছে। শ্মশানে যাই। কেউ কাঁদে। ফেরার সময় তাদের কেউ আবার হেসে হেসে ফোন করে – প্রিয়জন কে। গ্রাম টা প্রায় বৃদ্ধ শূন্য হয়ে গেলো। কত গল্প, উপন্যাস, স্মৃতি তাদের সাথে সাথে মিলিয়ে গেলো। কারুর কোনো আক্ষেপ নেই। নতুন গাছে নতুন পাতা। প্রকৃতির কোনো বেদনা নেই।
হরেন জ্যাঠা- পুকুর ধারে একটা গন্ধ রাজ ফুলের গাছ লাগিয়ে লাল সান বাঁধিয়ে দিয়েছিলো। যখন পড়তে যেতাম খালি পায়ে- রোজ দেখতাম হরেন জ্যাঠা হুঁকো খাচ্ছে আয়েস করে লাল সানে বসে। আর গন্ধ রাজ গাছটি যেনো তার দোসর- সাদা সাদা থোকা থোকা গন্ধময় ফুলে পুকুর পাড়ে যেনো বিয়ে লেগেছে। সেই গন্ধ এখনও আমি পাই ঘুমের মধ্যে। জ্যাঠা কে পুড়িয়ে আসার পথে গাছটি কে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। কোথাও কোনো বেদনা নেই। ফুলেরা হাসছে। গন্ধের মাদকতা লাল সান ফুঁড়ে বের হচ্ছে।
ঠাকুমা তার গল্প করত। বহু যুগ আগেকার গল্প। বৃদ্ধ বয়সে কিশোরী বেলার আবছা সব গল্প। পানা পুকুরে বেগনী ফুল। চার চোখা উনুনে ধান সেদ্ধ। তেলের অভাবে সাঁতাল দেওয়া মাছ। ঢেঁকি তে চাল গুড়ো – পৌষ পার্বণে। ছেলেদের চোখে ল্যম্পের কালি দিয়ে টানা কাজল। কাঁচা গরুর দুধে চাল মিশিয়ে খাওয়ার গল্প। দাদুর সাথে মাঠে লাল আলু তোলা। ঠাকুমা চলে গেলো। পুড়িয়ে আসার পথে চায়ের সাথে সিগারেট খেতে খেতে শেয়ার বাজারে চোখ। সম্বিত আসলে বুঝলাম আমার হয়ে গ্যাছে – চিত্রকর হতে গিয়ে আমি নিজেই চিত্র হয়ে গেলাম।
ঘরে নতুন রঙ হচ্ছে। বেশ ভালো লাগছে। হঠাৎ ফোন। শুনলাম অলোক এই কিছুক্ষণ আগে মারা গিয়েছে। একই সাথে অনেক ছবি ভেসে উঠলো। একসাথে চায়ের ঠেক। বাদাম তলায় মাতলামি। ভোরের বেলা মন্ত্র পাঠ। নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠলাম- আরে ভাই দেওয়ালে এখানে রঙ টা ঠিক হলোনা। সম্বিৎ আসল। গুম মেরে ভাবি আমি নিজেই চিত্র হয়ে গিয়েছি।
জীবন কি অদ্ভূত। জীবন ও প্রকৃতির অদ্ভুত সমন্বয়ে শুধু আনন্দের স্থান। বেদনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। যা কিছু যন্ত্রণা বোধ হয় সেগুলো ব্যক্তি মানুষের একেবারেই নিজস্ব। মানুষের মত ক্ষুদ্র এক প্রানী কে নিয়ে বেশি ভাবার সময় নেই প্রকৃতির। তার বুকেই প্রতিনিয়ত রচিত হচ্ছে নবরুপে নবীন চাল চিত্র।
সোনালী ধান মাথা নাড়ে। কুয়াশা ভেজা সকাল। চাষি যায় কাস্তে হাতে। এই সেদিনের সবুজ ধান শিশু আজ ফলবতী যুবতী।
চা খেয়ে এসে দেখলাম যুবতী ধানের সোনালী শিষ – পাটে পাটে শুয়ে আছে কাস্তের অমোঘ বাস্তবতায়।
