নিস্তব্ধতার প্রতিধ্বনি

সব্যসাচী মণ্ডল (হিন্দমোটর, হুগলী)

  রাত তখন প্রায় আড়াইটে। অঞ্জনবাবু তার পুরনো পৈতৃক বাড়ির লাইব্রেরি ঘরে বসে কিছু পুরনো নথিপত্র ঘাটছিলেন। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, আর বাতাসের শব্দে জানলার পাল্লাগুলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। হঠাৎ তার মনে হলো, পাশের বন্ধ ঘরটা থেকে কেউ যেন অস্ফুট স্বরে গান গাইছে।

   ​অঞ্জনবাবু একা মানুষ। বাড়িতে তিনি আর তার পুরনো পরিচারক হরিপদ ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু হরিপদ তো নিচের তলায় ঘুমোয়। তাহলে এই গান কোত্থেকে আসছে?

 ​তিনি টেবিল ল্যাম্পটা হাতে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে পাশের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘরটা গত বিশ বছর ধরে বন্ধ। ওটা ছিল তার বড় বোনের ঘর, যে এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। দরজার কাছে দাঁড়াতেই গানটা থেমে গেল। চারপাশটা একদম নিঝুম।

​অঞ্জনবাবু কাঁপা হাতে দরজার নব ঘোরালেন। আশ্চর্যের বিষয়, দরজাটা লক করা ছিল না। ভেতরে পা রাখতেই এক ভ্যাপসা ধুলোর গন্ধ নাকে এল। কিন্তু যেটা দেখে তার রক্ত হিম হয়ে গেল, সেটা হলো ঘরের মাঝখানে থাকা ড্রেসিং টেবিলটি।

  ​আয়নার সামনে একটা মোমবাতি জ্বলছে— একদম টাটকা মোমবাতি। আর আয়নার ধুলো মাখা কাঁচের ওপর আঙুল দিয়ে কেউ লিখেছে:

​”আমি ফিরে এসেছি, দাদা। কিন্তু তুমি কেন পালালে না?”

  ​ঠিক সেই মুহূর্তে অঞ্জনবাবু পেছনে কারো নিশ্বাসের শব্দ অনুভব করলেন। তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছিলেন না। আয়নার প্রতিবিম্বে তিনি দেখলেন, তার ঠিক পেছনে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে, যার হাতে একটা পুরনো আমলের রুপোর চুল বাঁধার কাঁটা।

  ​হঠাৎ নিচ থেকে হরিপদর চিৎকার শোনা গেল, "কর্তাবাবু! ওপরে যাবেন না! আমি চাবিটা খুঁজে পেয়েছি, ঘরটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া আছে!"

    ​অঞ্জনবাবুর কপালে ঘাম জমে উঠল। যদি ঘরটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া থাকে, তবে তার পেছনের এই ছায়াটা কে? আর তার নিজের ঘরের চাবিটা যদি নিচে হরিপদর কাছে থাকে, তবে তিনি এই ঘরে ঢুকলেন কী করে?

​অঞ্জনবাবু আয়নার দিকে ভালো করে তাকালেন। দেখলেন আয়নায় তার নিজের কোনো প্রতিবিম্ব নেই। শুধু ওই ছায়াটা আর জ্বলন্ত মোমবাতিটা দেখা যাচ্ছে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *