আলাপ

সঞ্চিতা সিকদার (নদীয়া)

কষ্ট কি জানি না, তবে মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।
সাফল্য কী তাও জানি না, কারণ হাজার চেষ্টা করেও কখনো কেউ সফল হতে পারবে না। সত্যিই কি সফল হওয়া যায় এক জীবনে?
একটা জিনিসে সফলতা পেলে আর একটা সফলতায় এগিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
তবে ব্যর্থতা থাকলে জীবনে সফলতার আস্বাদ পাবে।
সুখ কী আমি জানিনা, কখনো সুখি হতে চাইনি৷ তবে হ্যাঁ, একটা জিনিস আমি মনে প্রাণে চেয়েছি, সেটা হল ভালোবাসা৷ কিন্তু সেই ভালোবাসা সকলের থেকে চেয়েছি৷ কবির ভাবনায় বলি “সব থেকে বেশি ভালোবাসা চেয়েছি আমি সমুদ্রের কাছ থেকে।”
আমি আগে কখনো জানতামই না আমি পাহাড় ভালোবাসি, না সমুদ্র, না জঙ্গল।
একদিন শুধু আমি সমুদ্রের কাছে গিয়েছিলাম তারপর থেকে আমি জানতে পারলাম আমি সমুদ্রকে ভালোবাসি। মনের ভিতর দুমড়ে মুচড়ে যায় ভীষণ রকম ভাবে।
মনে হয় যে কারোর হাত ধরে যেন অনন্তকাল সমুদ্রের পাড়ে বসে থাকি৷ সে যেন তার বুকের মধ্যে আমার মাথাটা রাখতে দেয় আর তার হাত দিয়ে আমাকে তার বুকের মধ্যে আবিষ্ট করে নেয়।
আর দুজনে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের আসা যাওয়া দেখবো। তবে আমার ভালোবাসাটাও এখানেই শেষ না। আমার দৈনন্দিন জীবনে যারাই আছে সেই ছোট্টবেলা থেকে।
আমার বাড়ির নাম সোনা, তা আমি যখন আমার বাপের বাড়ি যাই, এখন বাপের বাড়ি বলতে হবে যেহেতু আমার এখন ঠিকানাটা শ্বশুরবাড়ি৷ তাই যখন আমি বাপের বাড়ি যাই, আমার পাড়ার সেই দাদারা, দিদিরা, কাকিমা, জেঠিমা, কাকু, জেঠু যখন বলে সোনা, ভালো আছিস? মনটা না ভরে ওঠে, ভীষণ রকম ভাবে ভরে ওঠে। মনে হয় সেই ছোটবেলায় যেন ফিরে গেছি৷
আবার যখন শ্বশুরবাড়ির রাস্তায় হাঁটি তখন শুনি, বৌমা ভালো আছো? ম্যাডাম ভালো আছেন? কিংবা দিদি ভালো আছেন? বৌদি ভালো আছেন? যে যেভাবে ডাকতে পারে আমাকে৷ তখন মনে হয় যে, আমিও ভালোবাসতে পেরেছি। আমায় এত মানুষ ভালোবাসে খুব লোভ হয়৷
যখন দিদি সারাদিন পর ছোট্ট করে একটা ফোন করে বলে বুনু ভালো আছিস? ভাই বলে, ছোটদি ভালো আছিস? আর বাবা-মা তাদের তো সেই ছোট্ট মেয়েটি আমি৷ সারাক্ষণ একদম সকাল থেকে বাবা-মায়ের ফোনেই ঘুম ভাঙে৷ সকালে প্রথমে বাবা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “আমার মা কেমন আছে?” এই কথাটা শোনা মাত্রই, জীবনে মনে হয় যেন সব পেয়ে গেছি৷ রাতে শুতে যাওয়ার আগেও একই রকম ভাবে বাবা -মা ফোনে কথা বলে। এমনকি আমার বাবা-মা শুধু আমাকেই না, আমার দিদিকেও, যেহেতু শ্বশুরবাড়িতে থাকে, তাকেও জিজ্ঞাসা করে সব সময়ের জন্য খবর নেন৷ সকাল -দুপুর -রাত্রি বেলা, স্কুলে থাকলে, যখন যেখানেই থাকি না কেন, বাবার ঠিক ফোন আসবে, খেয়েছিস? এখনও সেই ছোট্ট মেয়েটির মতো জিজ্ঞাসা করে যেন আমি তাদের কাছে সেই ছোট্ট মেয়েটি রয়েছি; স্কুলে গিয়েছি, টিফিনটা নিয়েছি কিনা, টিফিন খেয়েছি কিনা৷
একই রকম ভাবে, আমিও আমার তিন মেয়েকে ফোন করি, হাজব্যান্ডকে ফোন করি, বাবা-মাকেও ফোন করি৷ তারা যদি ভুলে যায় কখনো, আমি ফোন করি। তারা খেয়েছে কিনা, জিজ্ঞাসা করি৷ সেই গানটার মত “কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া,”
আর সত্যি, সকলের ভালোবাসা পেতে হলে সকলকেই ভালবাসতে হয়৷ নিজেকে নিঃস্ব করতে হয়। সত্যিকারের নিঃস্ব হচ্ছি, এতেও অনেক আনন্দ আছে, অনেক শান্তি৷ মনের ভিতরে সমস্ত কলুষতা বেরিয়ে যায়। এগুলো সব আমি আমার কথাই বললাম, সত্যিই এ জীবনে আর কিছু চাইনি। তবে চাইনি বললে ভুল হবে, চেয়েছি অনেক কিছু৷ পৃথিবীর সকল পরিবারের মানুষ যেন ভালো থাকে। ভালোর তো শেষ হয় না, একটা চাহিদা শেষ না হতেই আর একটা চাহিদার জন্ম হয়। একটা স্বপ্নপূরণ তো, আর একটা স্বপ্নের সৃষ্টি৷ তবে আরো যদি কিছু বছর বেঁচে থাকতে পারি, তাহলে আরো কিছু করার ইচ্ছে আছে৷ আমার মন মাঝে মাঝে না সব সময় বিধ্বস্ত, বিচলিত থাকে প্রতিটা ক্ষণে৷
হাঁটাচলা করি, ক্লাস করে, খাওয়া দাওয়া করে ঘোরাফেরা করি কিন্তু মন বিচলিত। যখন থেকে জীবনে বুঝতে শিখেছি সেই ছোট্ট বয়স থেকে৷ যেন কেউ বুঝতেও না পারে৷ আমার কান্না আসলেও আমি চোখের জল বের হতে দিই না, কারণ আমার পরিবার তারা যদি আমাকে দেখে কষ্ট পায়৷
কিন্তু আমার অনেক সময় মনে হয় আমাকে যারা ভালোবাসে আপাতত; মনে হয় ভালোবাসা আসলে জীবনের প্রতিটা ক্ষণে আপেক্ষিক৷ প্রতিটা জিনিস আপেক্ষিক, আর যেটা আজ আছে, কাল সেটা নাও থাকতে পারে৷ কিংবা যেটা আজ নেই কাল সেটা আবার আসতে পারে৷
আমার মুখ বইয়ের পাতায় ১০০০০ বন্ধু আছে, জানি না সবাই আমাকে দেখতে পায় কিনা, আমিও তাদের সবাইকে কখনো দেখিনি, একসাথে দেখা সম্ভবও না। কয়েকজনকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি, আবার আমাকেও কয়েকজন ঘুরে ফিরে দেখে। কোনো লাইক কমেন্ট চাই না, সকলকে দেখতে চাই, সকলে কেমন আছে খুব জানতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মুখ বইয়ের সিস্টেম এমন যে, আমি যাদেরকে সিন করবো তারাই আমাকে সিন করতে পারবে, না হলে যেমন চোখের আড়াল মনের আড়াল, সেই রকমই হয়তো হবে৷ আমরা সবাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব৷ এত বন্ধুর ভিড়েও সেই একাকী আমি ‘সঞ্চিতা সিকদার’। আমি এমন কখনো লিখি না, আজ লিখলাম। কিন্তু আমি এরকম সবসময় ভাবি, ভাবতেই থাকি৷
শম্পা চুনারী বলে আমার এক ফেসবুক ফ্রেন্ড আছে, ওকে আমি কখনো দেখিনি, জানি না কোনদিন দেখা হবে কিনা। তবে বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে প্রতিদিন মনের কথা লেখে, আমার খুব ভালো লাগে৷ নিজের অজান্তেই এভাবে ফেসবুকে যে কত কারোর সঙ্গে মনের মিল খুঁজে পেয়েছি, যেমন সঙ্গীতা কর খুব মনের কথা বলে৷ আমি যা কিছু পোস্ট করি, কিছু ফেসবুক ফ্রেন্ড আছে, যারা সর্বক্ষণ আমার পাশে থাকে, এও এক অন্যরকম ভালোলাগা৷ তাদের সঙ্গে আমার এ জীবনে কোনদিন দেখা হবে কিনা তাও জানি না। তারা কোনদিন, এইভাবে ভেবেছে কিনা আমি তাও জানি না।
সেই ছোট্টবেলা থেকে প্রতিনিয়ত স্কুল যাওয়া, প্রাইভেটে যাওয়া, বাড়ি আসা, মা-বাবা, দিদি- ভাই তাদের সঙ্গে সময় কাটানো। এখন বৈবাহিক সূত্রে আমি আর এক পরিবারের সদস্য, যে পরিবার আমার নিজের৷ তবে এখনো আমার সেই রুটিন রয়েছে। সকালে ওঠা, অনেক ব্যস্ততার মাঝেও নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আবার স্কুলে যাওয়া, আবার বাড়ি আসা, আবার পরিবারের সকলের সঙ্গে সেই সময় কাটানো৷ তবে এই ছন্দ না থাকলে জীবন হয়তো চলতো না। কারণ জীবন মানে ‘জী বাংলা’ আমি এত মজা করতে ভালোবাসি যে আজ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগে যখন মাস্টার ডিগ্রী করি সেই সময়কার আমার এক বন্ধু তো একসময় বলেই বসলো যে “তুই মনে হয় কেউ মারা গেলেও মজা করবি,” কথাটা শুনে সেদিন আমার একদম ভালো লাগেনি। আসলে ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যে আনন্দটা খুঁজে নিই, সেই কারণে এখনো বড় হতে পারিনি। বড় বলতে অনেক বয়স হয়ে গেছে আমার। তবে আমার মনের ছেলেমানুষি ভাবটা এটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এখনো সমবয়সীদের সাথে সেভাবে মিশতে পারি না, কোন বড়দের কথার মধ্যে ঢুকতে পারি না। আমার কলিগদেরও দেখেছি তারা কত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে। তখন আবার আমি চুপ করে থাকি। কোন জটিলতা আমার মধ্যে আমি এখনও নিতে পারিনি। এইতো ছোট্ট জীবন, হাসিমুখ রেখে সামনের মানুষের দুঃখ কষ্টকে আপন করে নিয়ে চলাতেই পরম সুখ৷

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *