সুমিতা সিনহা (দুর্গাপুর)

রোজকার মতো আজ সকালেও বাবা আর মায়ের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া। দুই এক জায়গায় মেরে বাবা মায়ের মুখে কালো দাগ করে দিয়েছে। মা খুব কাঁদছিল। বাবা যাবার সময় বলে গেছে আমি যেন কাজের থেকে এসে ওকে আর না দেখি। অপায়া একখানা। ওর মুখ দেখাটাও পাপ। আজ যদি ওকে বাড়ি থেকে বের না করেছিস তাহলে তোর পিঠেই চ্যালা কাঠ ভেঙে ফেলব। দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকে সাত বছরের অন্তু সব শুনেছে।দেখল মায়ের মুখটা ভয়ে শুকিয়ে গেছে। অন্ত বুঝতে পারে না কি নিয়ে ওদের এত ঝগড়া মারামারি। তবে এইটুকু বোঝে সব কিছুতেই যেন অন্তু চলে আসে। বাবার এই সব কথাই ছোট্ট অন্তু শিউরে ওঠে।
মা সব সময় আগলে রাখে। বাবার সামনে আসতেই দেয় না। বাবা কাজে গেলে অন্তুর যেন বন্দি দশা থেকে মুক্তি ঘটে। সারাদিন ছোটো ছোটো ভাইবোনদের সাথে খেলা করেই দিন চলে যায়। আর মাও যখন কাজে চলে যায় তখন যেন সে একাই রাজা। ভাইবোনদের দেখাশোনার ভার তার ওপর পড়ে। কোনো কিছুতেই বারণ নেই। যা মন চায় তাই করে। সে তো আর ইস্কুলে যায় না। ভাই যায় ইস্কুলে। মা বলে অন্তুকে পড়াশোনা করতে নেই। কেন করতে নেই অন্তু মাকে জিজ্ঞেস করেও উত্তর পায় নি। আর বোনটা তো এখনো খুবই ছোটো। ও ঘরেই থাকে।
একটা জিনিস অন্তু বুঝেছে সে তার ভাই বা বুনুর মতো নয়। তাহলে সে কার মতো? রোজই ভাবে একি কথা মাকে জিজ্ঞেস করতেও খুব ভয় পায়। এমনিতেই মা খুব কান্নাকাটি করে। রোজ রোজ বাবার কাছে মার খায়। মাঝে মাঝে তো মা ও বলে তুই মরে গেলে তবেই আমার শান্তি। বলেই আবার বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
বাড়ি থেকে বেরোনোও বন্ধ। বন্ধুরা সব কত খেলে।হারু,মিনতি,মনা,দুলাল,পূর্ণিমা,জগাই ওদের দেখলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। ওরাও বলে ‘এই অন্তু তুই আমাদের মতো নারে’। শুনলেই রাগ হয়। সে তো মানুষ একটা। পাড়ার বড়োরাও কত হাসে। ফিসফিস করে কি সব বলে ।
কাল পয়লা বৈশাখ। আজ বাবা কাজের থেকে আসার সময় সবার জন্য নতুন জামা আনবে। বাবা ওর জন্য কিছু আনবে না। তাতে ওর কোনো মন খারাপ হয় না। অন্তুর জন্য ওর মা জামা নিয়ে আসবে। সকালে মুদি দোকানের নেপাল কাকু বলে গেছে দোকানে পুজো দেখতে যাবার জন্য। মনটা একটু সময়ের জন্য আনন্দে ভরে উঠল। পরক্ষণেই মনে পড়ল নেমন্তন্ন খেতে যাওয়া নিয়ে হয়তো আবারও বাবা মাকে খুব মারবে। মায়ের ছলছল মুখটি মনে পড়তেই অন্তুরও মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলো সে যদি অনেক দূরে কোথাও চলে যায় তাহলে তো আর মাকে রোজ রোজ বাবার কাছে মার খেতে হবে না। মা কয়দিন কষ্ট পাবে তার পর হয়তো ভাববে ভালোই হয়েছে অন্তু চলে গেছে।
বাবা মায়ের আসার সময় হয়ে এলো দেখে অন্তু ভাই আর বুনুকে ঘরে ঢুকিয়ে দিল। ‘তোরা বস আসছি’ বলে দরজা বন্ধ করে অন্তু রাস্তায় নেমে এলো। সামনের রাস্তায় না গিয়ে বাড়ির পিছনের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল। কত দুর হেঁটে এসেছে বুঝতে পারলো না। ক্লান্ত শরীরটা ছটফটিয়ে উঠল একটু জল খাবার জন্য। সামনের চায়ের দোকানে একটু জল চেয়ে খেলো। মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে গোটা পাড়া খুঁজে বেড়াচ্ছে অন্তু অন্তু করে। এবার ভয়ে অন্তু কেঁদে উঠল। ছুটতে শুরু করলো মায়ের কাছে যাবার জন্য। চায়ের দোকানে থাকা লোকগুলো অন্তুকে ধরে নিল। সব কিছু শুনে নিয়ে বলল ‘চল আমাদের বাড়িতে’। ক্লান্ত হয়ে থাকা ছোট্ট অন্তু এখানে এসেই ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল দেখলো ঘরের মধ্যে বেশ কিছু অদ্ভুত লোককে। মায়ের মতো শাড়ি পরা অথচ গলাটা কেমন যেন ভারী ভারী। আবারও অন্তু কেঁদে উঠলো ‘আমি মায়ের কাছে যাবো’। ভিড় ঠেলে একজন এসে অন্তুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল ‘আমিই তোর মা। আজ থেকে আমাকেই মা বলে ডাকবি’। অন্তু ওই মানুষটার বুকের মধ্যে থেকে মায়ের শরীরের সেই গন্ধটা পেল। ‘মা’ বলে ডেকে দুহাতে অন্তু মানুষটিকে জড়িয়ে ধরল।
ওই মানুষটিও ঘরের মধ্যে থাকা সবাইকে বলল ‘আজ থেকে এর নাম হল বৈশাখী’ ।।।।