জীবন দর্শন

মৌমিতা মৌ (কলকাতা)

আঙুল উঁচিয়ে একটা ‘স্পর্ধা’ লেখার কথা ছিল,
জীবনের অগ্নিলিপি’তে খোদাই করে
উচিৎ ছিল লেখার “খবরদার”!
যেন দগ্ধ নগরীর প্রবেশমুখে
শেষ প্রহরীর উঁচিয়ে ধরা বর্শা।

কিন্তু শব্দগুলো মরচে পড়া তলোয়ারের মতো
খাপেই থেকে গেল।

চোদ্দো বছরের বনবাস..
সে কি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় ঝুলে থাকা সংখ্যা!
ওটা তো ছিল
দাঁতে দাঁত চেপে বেঁচে থাকার উপাখ্যান,
শুকনো পাতার নিচে চাপা পড়ে থাকা
অসংখ্য অসমাপ্ত আর্তনাদ।

হয়তো শপথ নেওয়া উচিত ছিল,
দ্রৌপদীর উন্মুক্ত কেশের মতো
আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া প্রতিশোধ।
তাহলে আরেকটি মহাভারত জন্ম নিত–
কুরুক্ষেত্র হতো হৃদয়ের ভেতর,
আর রক্তাক্ত হতো সম্পর্কের বংশবৃক্ষ।

কিন্তু আমি যুদ্ধ চাইনি।

নিঃশব্দে সরিয়ে নিয়েছি হাত,
যেমন জোয়ার ভাটার কাছে
নিজের সমস্ত দাবি ফিরিয়ে নেয়।
অথবা অস্তগামী সূর্য
শেষ আলোটুকুও গুটিয়ে নেয় গোধূলির আঁচলে।

ক্রমশ বুঝেছি..
হৃদ্যতার আস্ফালন আসলে কুয়াশার স্থাপত্য,
দূর থেকে প্রাসাদ মনে হয়,
কাছে গেলে দেখা যায়
সবই জলীয় বিভ্রম।

সহ্যক্ষমতা ক্ষয়ে গেছে
নদীর তীরে ভাঙা বাঁধের মতো।
এখন আর অকারণে চ্যালেঞ্জ নিই না,
কারণ প্রতিটি যুদ্ধ শেষে
বিজয়ীরও কেবল ধুলোই প্রাপ্য হয়।

আমি যাকে আপন ভেবেছিলাম,
সে বিশ্বাসকে ভেঙেছে
এমন সহজভাবে সরলতায়..
যেমন শিশিরবিন্দু মুছে ফেলে
ভোরের প্রথম রোদ্দুরের রেখা নিমেষেই।

একবারও ফিরে তাকায়নি সে অনুতাপে..
ভাঙা আয়নার রক্তক্ষরণে।

যা গেছে, তা যাক।
সব স্মৃতি সময়ের শিকেয় তোলা থাক..
পুরোনো কোনো জাদুঘরের মতো,
যেখানে নিষিদ্ধ স্পর্শের ধুলোয়
ঢেকে থাকে ইতিহাসের মৃতদেহ।

আজ নির্দ্বিধায় স্বীকার করি..
হয়তো কাউকে ততটা ভালোবাসিনি,
যতটা ভালোবাসলে
দুটি পৃথক নক্ষত্র
একই মহাকর্ষে আবদ্ধ থাকে যুগের পর যুগ।

যতটা ভালোবাসলে
একজন আরেকজনের কাছে
ফেরার একমাত্র ভূগোল হয়ে ওঠে।

তাই সমস্ত লেনদেনের সম্পর্ক থেকে
ইতি টেনে নিয়েছে মন।

এখন সে ফেরারি–
যেখানে সেখানে থামে না,
কোনো প্রতীক্ষালয়ের আলোয় বসে না।
শুধু দূর অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে যেতে জানে..
আসলে সবচেয়ে গভীর নিঃসঙ্গতাও
কখনও কখনও হয়ে যায়
অপ্রয়োজনীয় হৃদ্যতার চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *