কীভাবে শুরু হয়েছিল রাসলীলা – আছে বিশ্বাস

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী:-

       বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কালী পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় ‘রাস’। ‘রাস’ হল জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন। কার্তিক মাসের পূর্ণিমাই হলো রাসপূর্ণিমা। এটি শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব। কথিত আছে, এই দিন শ্রীরাধা ও বৃন্দাবনের গোপিনীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ রাস উৎসবে মেতেছিলেন। গোপিনীদের নাচ ও শ্রীকৃষ্ণের বংশীধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছিল বৃন্দাবন। শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণের এই মিলন উৎসবকে শ্রীচৈতন্যদেব নাম-সঙ্কীর্তনের মধ্য দিয়ে রাস মহোৎসবে পরিণত করেন। 

        কথিত আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর শ্রীকৃষ্ণের গঙ্গাস্নানের পর থেকেই শুরু হয় ‘রাসমেলা’।  অন্যমতে দুর্গাপুজোর পর কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সঙ্গে ‘লীলা’-য় মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সেই থেকেই কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে ‘রাসলীলা’ পালিত হয়ে আসছে।

         সংস্কৃত ‘রস’ শব্দ থেকে ‘রাসলীলা’ শব্দটির উৎপত্তি। ‘রাস’ কথাটির অর্থ হল ‘অনুভূতি’।      ‘লীলা’ মানে নৃত্য। এই নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের শুরু, মান-অভিমান এবং শেষে মিলন দেখা  যায়।  অর্থাৎ ‘রাসলীলা’ হলো একপ্রকার বিশেষ নৃত্য – Dance of Shree Krishna with Gopis, performed with full of emotions, love and bliss. এককথায় ‘রাস’ হলো আধ্যাত্মিকতার আড়ালে এক অসামান্য প্রেম কাহিনী যেখানে ভালবাসা হলো ‘শারীরিক’ চাহিদার পরিবর্তে আধ্যাত্মিক ‘মিলনের তিতিক্ষা’। বৈষ্ণব দর্শনে এই ‘রস’ বলতে মধুর রসকেই বোঝানো হয়েছে। বৈষ্ণবদের কাছে ‘রাস’ হলো ভক্ত ও ভগবানের মিলন উৎসব। 

          বস্ত্রহরণের দিন গোপিনীদের কাছে শ্রীকৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন পরবর্তী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি তাদের সঙ্গে রাসলীলা করবেন। শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বংশীধ্বনিতে মুগ্ধ হয়ে গোপিনীরা সংসারের মায়া মোহ ত্যাগ করে বৃন্দাবনে উপস্থিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিজেদের সমর্পন করেন। আসলে কৃষ্ণের প্রতি তাদের প্রেম আধ্যাত্মিক, জাগতিক নয়। তাদের সবটুকু দিয়ে তারা কৃষ্ণকে ভালবেসেছে। সেখানে কোন স্বার্থ নেই, কোন দ্বন্দ্ব নেই। তারা   কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা। শ্রীকৃষ্ণ তাদের নিজ নিজ গৃহে ফিরে সংসারধর্ম পালন করতে বলেন। কিন্তু গোপিনীরা ফেরেননি। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের মনস্কামনা পূরণ করার জন্য রাসলীলা আরম্ভ করেন। কিন্তু গোপিনীদের মন অহংকারে পূর্ণ হলে রাধাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের মধ্য থেকে অন্তর্ধান হয়ে যান। তখন গোপিনীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন এবং  একাগ্রচিত্তে শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি করতে শুরু করেন। ভক্তের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান গোপিনীদের মানব জীবনের পরমার্থ বুঝিয়ে দিয়ে ‘যতজন গোপিনী ততজন কৃষ্ণ’ হয়ে তাদের মনের ইচ্ছা  পূরণ করেন। এইভাবে জগতে রাস উৎসবের প্রচলন ঘটে।

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার – বিভিন্ন পুস্তক ও বিভাগীয় অধ্যাপকদের পরামর্শ)

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *