পলি সরকার ভট্টাচার্য্য (হলদিয়া)

শুভঙ্কর দা সুদীপ কে যখন এই বাড়িতে এনেছিল তখন পড়ন্ত বেলা, অফিস ছুটির পর আসা, ভগ্নপ্রায় দশা বাড়িটার,এক নিঝুম পরিবেশ। প্রথম দেখায় বোঝাই যাচ্ছিল বাড়িটার প্রাণ নেই। পশ্চিমের রোদের তাপে ও আলোয় হাড় জিরজিরে রুক্ষ বক্ষ ভেদ করা একতলা একটা বাড়ি।সামনে কিছুটা ফাঁকা জমি, টুকটাক গাছ গাছালি,সব ই ফসল সংক্রান্ত, পিছনের দিকে কয়েকটা বড় গাছ,ফলের।
বাইরে থেকে ‘তপতী বৌদি ‘ বলে ডাকতে একজন শ্যামলা কমবয়সী কিন্তু সপ্রতিভ তরুণী জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালো।
‘ও শুভঙ্কর দা, আসুন, আসুন। তবে বৌদি তো একটু বাজারের দিকে গেছে,ছাতা সাড়াবে, ওষুধ কিনবে আর কিসব যেন বলছিল।’
‘তাহলে কি আমরা পরে আসবো?’
‘না, না। আসুন আপনারা।আছি তো। আমরা জানতাম আপনারা কাল আসবেন।’
‘আমাদের একটু তাড়া আছে, তাই আজ ই এলাম।’
‘ভালো করেছেন।’
দরজা খুলে দিল সেই ছিপছিপে তরুণী। কথাবার্তা মার্জিত, আচরণ রুচিশীল। ভিতরে নিয়ে গিয়ে শিকল তোলা বন্ধ ঘরখানা খুলে দিল।ঘর মোটামুটি। লাগোয়া কিছুটা বাড়ানো জায়গা আছে। বেরিয়ে এসে উঠোন পেরিয়ে কলতলা। চৌবাচ্চায় জল উপচে পড়ছে।ঘরে উঠোনের দিকে ও বাইরের দিকে মোট দুটো জানলা, ব্যবহারের জন্য একটা তক্তপোস আছে। দেওয়ালে তাক, ঝোলানো আলনা, একখানা কুঁজো ও তার স্ট্যান্ড, ঘরে এমাথা থেকে ওমাথা শক্ত দড়ি টাঙানো, একটা গোটানো মশারী ও পেরেকে একটা সস্তার আয়না।
ঠিক আছে,যা জোটে,এই পাওয়াই অনেক। মেসে ওই বারোয়ারী পরিবেশে দম বন্ধ হয়ে আসছিল সুদীপের।এ বেশ নিজের মতো থাকা যাবে। লাগোয়া জায়গায় স্টোভ জ্বেলে দুটি ফুটিয়ে নেয়া যাবে। ঘরের তুলনায় ভাড়া একটু বেশি, সব তো আর মিলবে না। বর্ষায় কলঘরে যেতে এরা ছাতাও দেবে। কিছু মানতেই হবে। তরুণীর নাম বোধহয় ‘সুপ্তি’ বেশ গোছানো কথাবার্তা, দুমাসের ভাড়া অগ্রিম দিতে হবে।শুনে সুদীপ থমকে গেল। শুভঙ্কর দা বললো, ‘রাজী হয়ে যাও ভাই,নিঃঝঞ্ঝাট বাড়ি, একদম নিরিবিলি, গলি দিয়ে হাঁটা পথ, তোমার রাহা খরচ লাগবে না, আর দুই মহিলার সংসার,কেউ নাক গলাবে না।’ তরুণী সঙ্গে সঙ্গে ফোঁস করে উঠলো,’ওরকম বলবেন না শুভঙ্কর দা, এটা ঠিক নয়।’
যাইহোক চলতি মাস ফুরোতে এখনও এক সপ্তাহ বাকি, সে বিষয়ে আগামীকাল সরাসরি তপতী বৌদির সঙ্গে কথা হবে ঠিক হলো।
‘তপতী বৌদি ‘ শক্ত পোক্ত একজন কেজো মহিলা। যেমন কর্মঠ, তেমন সচেতন। তবে ননদ বৌদি দুজনের চেহারায় দারিদ্র্যতার ছাপের সঙ্গে আত্মমর্যাদা ও শিক্ষার/রুচির ছাপ স্পষ্ট ।তো তপতী বৌদি বললো সেরকম হলে দুচার দিন আগে চলে এলেও হবে, শুধু ধূমপান চলবে না।আর সুদীপের সে অভ্যাস ও নেই।
মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছে সে। তবে স্টোভ জ্বেলে রান্না করার মতো আহাম্মুকের কাজ আর হয়না।চাল,ডাল,নুন,তেল, কেরোসিন জোগাড় করে দেখা গেল দেশলাই আনা হয়নি। অগত্যা বৌদির স্মরণাপন্ন।একার সংসারে এটা আছে তো ওটা নেই।এটা নেতিয়ে গেছে তো ওটায় পিঁপড়ে ধরেছে।সেটা শুকিয়ে কাঠ তো আবার অন্যটা ভিজে এ্যকসা।কি যে করে? খিদেয় পেটে ছুঁচো ডন দিচ্ছে তো ঘরে এমন কিছু নেই যে দুটি খেতে পায়। পরদিন আবার ভাতের ফ্যান ফেলতে গিয়ে হাত পুড়ে গেল।ওরে ব্বাস! জ্বলুনি কাকে বলে।উঠোনে ছোটাছুটি করছে দেখে তপতী বৌদি হাতটা ধরে টেনে চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে দিল।চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো। ভাবলো আবার মেসেই ফিরবে।
বিকেল সন্ধ্যের মুহূর্তে ঘরে ফিরে শুয়ে ছিল সুদীপ।বাইরে অল্প কথাবার্তা হচ্ছে। এমনিতে চুপচাপ বাড়ি তবে একটু আচ্ছন্নের মধ্যে মনে হলো পুরুষ কন্ঠ।সজাগ হলো, ভাবলো বাড়িতে পুরুষ তো কাউকে দেখেনি। তবে মাঝেমধ্যে উঠোনের দড়িতে কমদামী আধময়লা ধুতি ও ফতুয়া শুকোতে দেখে। মানুষ কাউকে দেখেনি। শুভঙ্কর দা বলেছিল দুজন মহিলার সংসার, বিবাহিতা/ অবিবাহিতা। যাক কে যাক, এখন একটু ঘুমোই তো।
দরজা খোলা তবুও শিকল নাড়ার শব্দ।তপতী বৌদি ডাকছে। অগত্যা উঠে গেল। বাইরের উঠোনে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। তরুণী সুপ্তি, চায়ের কাপ, মুড়ি মাখা ইত্যাদি। তপতী বৌদি বললো,’সকাল থেকে তো কিছু খাওয়াই হয়নি,এসো ভাই আমাদের সঙ্গে দুটি মুড়ি খাও। তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই,ইনি নির্মল বাবু, কাছেই থাকেন।’
বেশ,গল্পগাছা চলছে, শুধু সম্পর্ক টা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। নির্মল বাবু বেশ সংযত, যেটুকু মস্করা করছে তা ওই সুপ্তি। বৌদি বলল রাতের খাবার দেবে,অন্তত হাত সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত।
প্রায়ই নির্মল বাবু আসেন,সুপ্তির উচ্ছাস উথলে ওঠে।দুজনে মুখোমুখি বসে কতো গল্প ই যে করে, ভদ্রলোক কিছু একটা ব্যবসা করেন, তবে তপতী বৌদি বেশীরভাগ ই ঘরের ভেতরে ব্যস্ত থাকেন। রান্নাবান্না আহামরি কিছু নয়, গরীবের ঘরে যেটুকু জোটে,বা নিজেরা যা ফলায় তাই সযত্নে ভাতের থালায় সাজিয়ে দেন, মুখে কেমন প্রশান্তি ও বেদনা মাখা। বৌদি উঠে গেলেই সুদীপ ও গুটিগুটি পায়ে সরে আসে বা এটাসেটা ছুতোয় বেরিয়ে পড়ে। কখনো ফিরে দেখে ওনারা তখনো গল্প করছেন ও সুপ্তি বৌদিকে ডাকছে,
‘এইযে যাই,যাই। হয়ে গেছে, হয়ে গেছে।’
সুপ্তির সমানে নির্মল বাবুর সঙ্গে মজা করা,ছুতোয় নাতায় হেয় করা, কুমড়ো ফুল তুলে এনে তাকে ভেজে দেওয়ার জন্য রাখতে বলা এসব দেখে ভারি অবাক লাগে সুদীপের। ভাবে এরা বিয়ে করে না কেন? সব কেমন গয়্্ গচ্ছ ভাব।
হঠাৎ একদিন বাড়িতে এক বয়স্ক মানুষ এলেন। সোজা ভেতরে চলে গেলেন।নির্মল বাবুকে কিন্তু কখনও সুদীপ ভেতরে যেতে দেখেনি।পরে জানতে পারলো ইনি তপতী বৌদির কাকাশ্বশুর হন। খোঁজ নিতে এসেছেন।আর অন্য উদ্দেশ্য ও আছে। তিনি যে খুব একটা কাঙ্খিত নন সেটা বোঝা যাচ্ছিল।সুদীপ ভাবে অন্য বাড়ি দেখি,এমনি খারাপ কিছু নয়, তবুও কি যেন অজানা সব ব্যাপার। এদিকে এখন আর রান্নাও করে না। প্রতি মাসে ভাড়ার সঙ্গে একটা ভালো টাকা বৌদির হাতে দেয়।আর একটু সরু চাল না হলে সে খেতে পারেনা, চালটা এনে দেয়। বলতে গেলে এখন আর অতো অসুবিধাও হয়না।ঘর খোলাই থাকে, বৃষ্টিতে বিছানা ভেজে না। কেউ না কেউ জানলা দিয়ে দেয়। শুকনো জামাকাপড় ঘরে গোছানো থাকে,মেঝে পরিষ্কার, কুঁজোয় খাবার জল, ছাড়েই বা কি করে?
তবে মাঝেমধ্যে সবকিছু নিয়ে কেমন রহস্য রহস্য লাগে। মনে হয় বাড়িতে অপর একজন কেউ আছে যাকে সে দেখেনি, গলার স্বর শোনেনি। উঠোনের ধুতি ফতুয়া কার?তার অবর্তমানে কেউ আসে কি? একদিন একটু সাহস সঞ্চয় করে দুজনকে একসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিল, তপতী বৌদি হেসে বললো,’ভাবো, ভেবে বলো।’
সুপ্তি বললো,’ভূত আছে,ভূত, জ্যান্ত ভূত।’
‘দাদা কি বাইরে চাকরী করেন?’
‘আরে না ভাই,সে ক্ষমতা তার নেই।’
‘তবে?’
‘তবে আর কি, সুখী মানুষ, শুয়ে শুয়েই কাটিয়ে দেয়।’
সুদীপ আর কথা বাড়ায়নি।
দেখতে দেখতে সুদীপের বছর দেড়েক কেটে গেল। একদিন অফিস ফেরত দেখলো বাড়ির সামনে লোকজনের ভিড়। নির্মল বাবু তো আছেনই,সেই কাকা শ্বশুর ও আছেন। থমথমে, নানান আলোচনা চলছে। আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে কেউ মারা গেছে।বুকটা ধ্বক করে উঠলো সুদীপের।
মারা গেছেন এবাড়ির একমাত্র পুরুষ অ্্শীদার তপতী বৌদির স্বামী। বিয়ের একমাসের মধ্যে যে নারকেল গাছ থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়। কোলকাতায় দীর্ঘ চিকিৎসায় প্রাণে বাঁচলেও জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যান।তা আজ হলো প্রায় বিশ বছর।এ সংসারে তপতী বৌদির শাশুড়ি মা ছিলেন না। সুপ্তি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। তপতী বৌদির শ্বশুর মশাই তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়ে ছিলেন আজীবন এ সংসার ও স্বামীকে সে দেখবে। সেই গচ্ছিত টাকায় কুড়ি বছর কোনোরকমে চলেছে। সুপ্তি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বলতে গেলে ফ্রী বলে পড়েছে। তপতী বৌদি ও বিয়ের সময় ফাস্ট ইয়ারে পড়তো। এখন বাজার দরের সাথে পাল্লা দিতে ও সুদ কমে যাওয়ার কারণে এই বছর দেড়েক ঘর ভাড়া দিয়েছে।খানিক সম্বিৎ ফিরতেই সুদীপ শুভঙ্কর দা কে খবরটা দিল।
পরের দিন অফিস যাওয়া হয়নি। তার পরের দিন সুদীপ অফিস গিয়ে দেখলো নির্মল বাবু শুভঙ্কর দার সামনে বসে আছে। সহকর্মীরা বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করছে, তাদের মতে ভারতবর্ষকে দেখতে ও জানতে হলে বাইরে যাওয়া দরকার।
পারলৌকিক ক্রিয়া নম নম করে মিটে যাওয়ার পর একদিন শুভঙ্কর দা সুদীপের সাথে বাড়িতে এলো। নির্মল বাবু আগেই উপস্থিত ছিলেন।চা পর্ব, এটা সেটা কথার পর নির্মল বাবু বললেন,’আমার বোনের বিয়ে দেবো ঠিক করেছি।’
‘বাঃ এতো ভালো খবর।’
‘নাহলে আমার এই আধবুড়ো বয়সেও ঘরণী ঘরে আসতে পারছে না।’
‘এটাই তো সাধারণত হয়।’
কিছুক্ষণ মৌনতা।
শুভঙ্কর দা হঠাৎ বললেন,’সুদীপ এবার বিয়ে করো।’
‘হ্যাঁ……., এই দেখি।’
‘না,দেখি নয়। বাড়িতে জানাও। কেন সুপ্তিকে কি পছন্দ নয়?’
‘সুপ্তি!!!!’
‘হ্যাঁ।’
‘মানে?’
তপতী বৌদি বললো, আমার এই বোন সম ননদিনীকে পাত্রস্থ না করলে যে আমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা হবে,আর আমিও নির্মলকে বঞ্চিত করবো।’
‘মানে?’
নির্মল বাবুর পাশে তপতী বৌদি? সে তো সুপ্তিকে জানতো।সুদীপের মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে মাথার মধ্যে দুন্দুভি বাজছে। বলতে গেলে সুপ্তিকে সে কোনোদিন চোখ তুলে দেখেইনি।সে রাতে সে আর কিছু খেলো না।আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো।
নির্মল বাবু ওষুধের whole seller, ওষুধের দোকানে তপতী বৌদির সঙ্গে তার পরিচয় ,আলাপ, বন্ধুত্ব, বাড়িতে আমন্ত্রণ, সমব্যথী,তথা প্রেম ও দীর্ঘকালীন অপেক্ষা।এতোকাল যাবতীয় ওষুধ, ডায়াপার সব তিনি ই জুগিয়ে এসেছেন। কারণ যৎসামান্য টাকায় তিনি সেগুলো সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া আর কোন সাহায্য এই ননদ/বৌদি নেয়নি। তাদের যেটুকু সাক্ষাৎ এই ওষুধ কে কেন্দ্র করে যা চিরকাল সুপ্তি করে দিয়েছে।
এই বাড়ির দলিলে এক বড় ফাঁক আছে।পঙ্গু ছেলের জন্য তপতী বৌদির শ্বশুর মশাই এবাড়ি জীবন সত্ত্ব করে জ্ঞাতী ভাইয়ের থেকে টাকা নেন। তবে যদি সুপ্তির বিয়ে হয় ও সন্তান জন্মায় তখন এবাড়ি তাদের ই থাকবে। সেক্ষেত্রে সুদীপ যেখানে থাকে সেইটুকু কাকা শ্বশুর পাবেন। তপতী বৌদি অন্য কাউকে বিয়ে করলে বাড়ির অধিকার হারাবে। মৃতপ্রায় স্বামী সংসার সামলে ননদিনীর বিয়ে দেওয়ার মতো অর্থ, সামর্থ্য কোনোটাই তপতী বৌদির ছিল না।অতএব…………….
পরদিন সকাল সকাল চা টুকু খেয়েই সুদীপ বাড়ির জন্য রওনা হলো ও অফিসে ছুটির আবেদন পাঠালো। ভীষণ আনমনা। ট্রেনে জানলার ধারে বসে গাছপালা সব উল্টোদিকে ছুটছে দেখে তার মনে হলো, সহকর্মীরা খরচ করে বেড়াতে গিয়ে ভারতবর্ষ দেখার কথা বলছিল না? সে কি তাদেরকে বলবে,
‘আমার বাসায় চলো, ভারতবর্ষ কেমন তোমাদের হাতের নাগালে আছে, দেখিয়ে দেবো।।’
