ভাষ্কর্য্য
অদিতি চক্রবর্ত্তী (কলকাতা)

চিত্তরঞ্জন শহরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে বহু বছরের পুরোনো মহুয়া গাছটি।
লোকেরা বলে, এই গাছ নাকি সব দেখেছে,
বর্ষার প্রথম বৃষ্টি, যুদ্ধের ভয়, প্রেমিকার অপেক্ষা,প্রেমিকের মৃত্যু আর মায়ের প্রার্থনা।
একদিন স্কুল থেকে শিক্ষকতা করে ফেরার পথে আদি গাছটার গুঁড়ির দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল।সে স্পষ্ট দেখতে পেল,একজন নারী যেন গাছের ভেতর বন্দী হয়ে আছে।মুখ নেই, চোখ নেই,তবু বুকভরা এক নীরব আর্তি।আদি ঘরে ফিরে তার স্বামীকে বলল,“গাছটার ভেতরে কেউ আছে।”পতিদেব হেসে বললেন,
“ওটা কেউ নাগো, প্রকৃতির খেলা।
কিন্তু মানুষ যদি ভালোবাসা নিয়ে তাকায়,
তাহলে গাছও গল্প বলতে শুরু করে।”
সেদিন রাতে আদি স্বপ্ন দেখল—
গাছের ভেতরের সেই নারী ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে বলছে,
“আমি এই মাটির স্মৃতি।
যারা ভুলে যায়, আমি তাদের মনে করিয়ে দিই।জীবন কেটে যায়, কিন্তু প্রেম গাছের মতো বেঁচে থাকে।”
পরদিন থেকে আদি যখনই কষ্ট পেত,
সে গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়াত।
কোনো কথা বলত না—
শুধু গাছের নীরব ভাস্কর্যের দিকে তাকিয়ে থাকত।
কিছু প্রেম একসাথে বাঁচতে পারে না।
কিন্তু মরেও আলাদা হয় না।
আজও নাকি গোধূলির সময় যদি কেউ সেই মহুয়া গাছটার কাছে চুপ করে দাঁড়ায়,
তবে বাতাসে খুব আস্তে দুটি কণ্ঠ শোনা যায়,
“আমি এসেছি…”
“আমি অপেক্ষা করছিলাম…”
তারপর চারদিক আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়।
শুধু মহুয়া গাছটা দাঁড়িয়ে থাকে,
এক অনন্ত অসমাপ্ত প্রেমের সাক্ষী হয়ে।
কিছু কিছু প্রেম গাছ হয়ে যায় অনন্ত আবেশে
অপেক্ষা আর অশ্রুবিন্দু বাকলে মেলে-মেশে
সাঁঝের আলো মুছে গেলে দুটি ছায়া গুটিগুটি আসে
চোখে চোখে স্বপ্ন বোনে উদ্দাম ভালোবাসে
আজও নাকি রাত গভীরে মহুয়া গাছের ভাঁজে
একটি নারীর গল্পকথা বাঁচতে চেয়েই সাজে।
বছর বছর গাছের গায়ে ফোটায় নতুন রূপ
চাঁদ ঝরে যায় মহুয়া ফুলের বোঁটায় টাপুরটুপ।

