অঙ্কিতা চ্যাটার্জ্জী:- সেদিন জাঁকজমক পূর্ণভাবে দুর্গাপুজো করার মত আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও বাড়ির মহিলাদের দাবি মেনে দুর্গাপুরের খাঁটপুকুরের ‘মণ্ডল’ পরিবার শেষপর্যন্ত ভক্তিকে সম্বল করে পুজোর ঘট এনে আটচালায় ভক্তি সহকারে দুর্গা মায়ের পুজো শুরু করেন।
এসব প্রায় দেড়শো বছর আগের ঘটনা। ধীরে ধীরে ‘মণ্ডল’ পরিবারের আর্থিক উন্নতি ঘটেছে। গড়ে উঠেছে একচালার বিশাল ঠাকুর দালান। এসেছে মৃন্ময়ী মাতৃ প্রতিমা। শুরু হয়েছে জাঁকজমক পূর্ণভাবে পুজো। তবে আজও প্রথম দিনের মতই ভক্তি ও আন্তরিকতা বজায় আছে। ‘মণ্ডল’ বাড়ির সদস্যদের বিশ্বাস দুর্গা মায়ের কৃপার জন্যেই এটা সম্ভব হয়েছে। নিজস্ব রীতিনীতি আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজও মায়ের পুজো হয়ে থাকে। সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে ‘মা’ আসেন মর্তে। তাই তার আর এক নাম আনন্দময়ী।
রথযাত্রার পূর্ণলগ্নে মায়ের কাঠামো তৈরি করে তাতে প্রথম মাটি লেপন করা হয়। শুরু হয় মায়ের আসার প্রতীক্ষায় দিন গোনা। তখন অন্য অনুভূতি কাজ করে পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ে। অপেক্ষার দিন যেন শেষ হয়না!
ষষ্ঠীর দিন সকাল থেকেই ঢাকি তার ঢাক নিয়ে হাজির হয়ে যায়। ঢাকের আওয়াজে খুশির হাওয়া বয়ে যায় ‘মণ্ডল’ পরিবার সহ গোটা গ্রামবাসীদের মনে। গন্তব্যস্থল একটাই – ‘মণ্ডল’ বাড়ির মায়ের মণ্ডপ। সবার উপস্থিতিতে মিলনামেলায় পরিণত হয় পুজো মণ্ডপ। সমস্ত মানুষ একত্রিত হয়ে সেই চারদিন মায়ের মণ্ডপে থেকে পুজোর সমস্ত জোগাড় করে থাকেন।
সপ্তমীর ভোরে স্নান সেরে সমস্ত নিয়ম মেনে শুরু হয় পুকুর থেকে দোলায় মায়ের ঘট আনার প্রস্তুতি। রীতি মেনে বাড়ির এয়োতিরা মা’কে বরণ করে নেন। পুরোহিত মাতৃ প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন।
এখানে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়। মহাঅষ্টমীর সন্ধিক্ষণে ছাগের পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি হয়ে থাকে। ‘মণ্ডল’ বাড়ির বিশ্বাস – তখন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজ মনের বাসনা মাকে জানালে সেটি পূর্ণ হয়ে থাকে। সেই সময় মা যেন মাটির প্রতিমা থেকে জীবন্ত প্রতিমা হয়ে ওঠেন। তাইতো তখন উপস্থিত গ্রামবাসীদের হাত জোড় করে অপলক দৃষ্টিতে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। ভক্তি ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত এক অপরূপ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নবমীতেও চালকুমড়ো বলি হয়ে থাকে।
দশমীর পুজোর শেষে ঘট বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের বিদায়ের সুর বেজে উঠে। এবার মায়ের কৈলাসে ফিরে যাওয়ার পালা। বোবা কান্না সম্বল করে মা ফিরে যান শিবের ঘরে।
ওদিকে আত্মীয় স্বজনদের নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। চারটে দিনের আনন্দমুখর পরিবেশ মুহূর্তে পরিণত হয় বিষাদঘন পরিবেশে। যেতে মন না চাইলেও যেতে হবে। আবার অপেক্ষা এক বছরের। শুরুতে খুশির রেশ থাকলেও শেষে একরাশ বিষণ্নতা সবাইকে গ্রাস করে। ‘মণ্ডল’ বাড়ির আশা – মায়ের কৃপায় আগামী দিনগুলো এভাবেই চলবে।