কবিতা ✍ Final Exposer

এই বৃষ্টি এই রোদ্দুর চিলেকোঠা

এই বৃষ্টি এই রোদ্দুর চিলেকোঠা

লিপিমিতা তনুশ্রী (কলকাতা)

মায়াময় রূপকথারা জড়িয়ে ধরে অনুক্ষণ
একান্ত যাপন চিলেকোঠার ঘরে ক্ষণিক তরে
বিশ্রাম অবকাশ না কৌতূহল, না-কি নিঃসঙ্গ পরবাস!
কত জনমের স্মৃতিধুলো ছাপ পিয়ানো সারেঙ্গীতে
হাতের স্পর্শ, সুরের মূর্চ্ছনা আজ অতীত ক্যানভাসে
ভৈরবী, বিলাবল, মেঘমল্লারে — বৃষ্টি নামে!
পুরনো আসবাবপত্রের মাঝে জেগে রয় প্রাচীন বৈভব
কাঠের চেয়ার-টেবিল, সিংহ-মুখ দেয়াল-আলমারি
সেগুন না মেহগনি জানিনা, জানি না কত বর্ষবলয় চিহ্ন
আঁকা আছে সেইসব সাবেকী সম্ভারে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনে ;
শুধু জানি পিতামহ, প্রপিতামহ অথবা তারও আগের
পূর্বপুরুষের স্মৃতিময় হাতছানি, স্নেহ-মায়া-ঘ্রাণ
লেপে আছে পরতে পরতে অদৃশ্য অনুভবে ;
রঙচটা ফুলদানি, দোয়াত-কালি, ধুলোর আস্তরণ
মলিন করেছে আপামর পিতলের সুদৃশ্য শৌখিন বস্তু সব।
চেয়ার-হাতলে ছাপ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নির্যাসে ব্যাকুল নয়নে
অধর-ওষ্ঠে হাজারো প্রশ্ন উৎস খোঁজে, ঘুরপাক খায় চারপাশ —
কোনো এক অচিনপুরে অনির্দেশ্য অভিযান
মন ও মগজের ভিতর অবিরাম স্রোত প্রবহমান।

কত যুগ হেঁটে যাই— পুরনো শহর-নগর, অলিগলি পথ,
পথ বেয়ে চলে গেছে কোন সে সুদূর রূপকথা বন্দর
বন্দর অন্তর আসা-যাওয়া কোলাহল আপামর বিস্ময়
স্তম্ভিত, বিস্মৃত, ফেলে যাওয়া, ছুঁয়ে যাওয়া অজস্র নোনাজল ;
জলের ভিতর শতসহস্র শব্দের বুদবুদ ধুকপুক স্পন্দন শিহরণ
কবে যে মিলিয়ে গেছে বহু ক্রোশ পেরিয়ে আলোকবর্ষ দূরে
তবু কিছু পরমায়ু থেকে গেছে চেয়ার-টেবিলে কলমদানিতে।
চন্দন শরীরের ঘ্রাণ আজ ম্রিয়মান দীর্ঘ প্রতীক্ষাতে অনন্ত যাপনে
একরাশ হাহাকার কলম-তুলিতে, ভূর্জপত্রে, জীর্ণ চিঠিতে —
কালের হিসাব নেই কত কাল পেরিয়েছে আঙুলের স্পর্শ
নেই ভাবনার দোলাচল সৃষ্টির দ্যোতনা আজ রুদ্ধ পরিসর
শুধু ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে ধূসরতা প্রেম ঢাকে আপাদমস্তক
জলছবি আঁকিবুঁকি মেহনতী মানুষের কত-শত রূপ
বুকের আগলে শিকড় আঁকড়ে রেখেছে কিছু শব্দকল্পদ্রুম
সময়ের হিসাব-নিকাশ, ইতিহাস-পরিচয়, অমূল্য সম্ভার—
বাকি সব পড়ে থাকা মোহ-মায়া ছায়া-কায়া নিঃসীম শূণ্যতা
পাক খায় আবহমান, জীবনের সংযোগে জীবন যে বহমান
নীরবতা ততোধিক — সভ্যতা গতিপথ বয়ে চলে ঋণ।

চোখ বুজে কান পাতি গহীন অরণ্যে হৃদয় প্রান্তরে
বিপন্ন শতাব্দী প্রজন্মের হাত ধরে অতলান্ত অনুভবে—
সোঁদা-গন্ধ চারিদিক ভিজে আস্তরণ, মায়ামৃগ সংসার
না-কি শৈবালদামে সময়ের প্রলেপ যুগ-যুগান্তর!
বাইরে তখন অঝোরধারায় বৃষ্টি জলোচ্ছ্বাস —
কার্নিশে ভেজা কাক ডাকছে অবিরাম ;
অসহায়তা না নিঃসঙ্গতা কে জানে—
তবে কি একান্তে আজ এসেছে ফিরে চিলেকোঠার ঘরে
সোনার-কাঠি রূপোর-কাঠি সভ্যতা সংগ্রামে!

তখন শুধু অন্বেষণে, তখন আমি আপনমনে
ভিজছি শুধু রোদ-বৃষ্টি গায়ে মেখে বিহ্বল আবেশে।।

F

Final Exposer

Final Exposer এর রিপোর্টার