কবিতা ✍ Final Exposer

চেনা বৃত্তের বাইরে

চেনা বৃত্তের বাইরে

সুমিতা সিনহা (দুর্গাপুর)

                 চিলেকোঠার ঘরটায় সময় কাটাতে বেশ ভালোই লাগে তপতীর। এখান থেকে জানলা দিয়ে খিড়কির পুকুরটা দেখা যায়। বিকেল তিনটে বাজতে না বাজতেই ভিড় জমেছে। আজ শনিবার পুকুরে জাল ফেলার দিন। তাই কচিকাঁচাদের সাথে শরিকি বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও জড়ো হয়েছে সেখানে। এক দৃষ্টিতে সেই দিকেই তাকিয়ে আছে তপতী।

   এটা কাকিমার বাপের বাড়ি। অনেক পুরনো আমলের বাড়ি। এখন পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে আর সময় মতো সেই ভাবে সংস্কারই হয় না। শুধু ভগ্নাংশটুকুই পড়ে আছে। কাকিমা এলেই ছোট ভাইয়ের কাছে ওঠে। অত্যন্ত সহজ সরল মানুষ কাকিমার এই অকৃতদার ভাইটি। সেই কবে একবার তপতী এসেছিল ছোট বেলায়। আর এই আসা হল তাও আবার কাকিমার জোরাজুরিতে। প্রায় এক প্রকার জোর করেই নিয়ে এসেছে কাকিমা। এসেই কোনো রকমে একটুখানি খেয়ে নিয়ে সোজা এই চিলেকোঠার ঘরে। মেয়ের দায়িত্ব তো এখন কাকিমার । 

  মাস দুয়েক আগে তপতীর ওভারীতে টিউমার হওয়ায় অপারেশন হয়েছে। সব কিছু ঠিক ঠাক থাকলেও ডাক্তার বলেছেন একটু জায়গা পরিবর্তন করতে। শ্বশুর বাড়ির যৌথ পরিবারে সেটা কোনো দিনই সম্ভবপর নয় । আর সৌমেনের তো এই সব দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে তার নিজের অফিস আর পরিবারের সদস্যদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। বাধ্য হয়েই কাকা-কাকিমা তপতী আর রিনিকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। রিনি তপতী আর সৌমেনের চার বছরের মেয়ে ।

  সেই কোন দুপুরে চিলেকোঠার ঘরে এসেছে। এখন প্রায়  বিকেল শেষ হতে চলল। আর বসে থাকল না তপতী নেমে এলো নীচে। রান্না ঘরে কাকিমার আওয়াজ পেয়ে বলল "কাকিমা আমি একটু ঘুরে আসি রিনি রইলো "।আর দাঁড়াল না। খিড়কির পুকুরের পাড় ধরে গ্রামের মাঝ বরাবর যে পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে সেখানে উঠে এলো। ইচ্ছে করলো একবার গ্রামের শেষ প্রান্তে যে গৌড়িয় মঠ আছে সেখানে ঘুরে আসতে। জায়গাটা খুবই সুন্দর। কতদিন যে মালি কাকা , বামুনদা ওদের দেখে নি। কেমন আছে সবাই কে জানে। আজ এতদিন বাদে ওকে দেখে ওরা সবাই চমকে উঠবে। এখন নিশ্চয়ই ওখানে সবাই বৈকালিক আড্ডা দিতে বসেছে। ওদের কথা মনে পড়তেই খুশিতে তাড়াতাড়ি অসুস্থ শরীর নিয়ে হাঁটতেও পারছে না। খুব ভুল হল যদি একটা জলের বোতল নিয়ে আসত  ।

   হাঁটতে হাঁটতে ভাবে কী অদ্ভুত জীবন তার। মা সেই কোন কালে চলে গেলো। আর বাবা সাথে সাথে সন্ন্যাস নিয়ে নিল সংসার থেকে। বাবার বাল্য বন্ধু নিঃসন্তান হওয়ায় তারা বুকে টেনে নিল। তখন কতই বা বয়স তার। সবাই বলেছিল দেখবি বিয়ের পর তোর নিজের একটা বাড়ি হবে! সংসার হবে! কোথায় আর কি হলো  !

সৌমেন তো কোনোদিন কাজের দোহাই দিয়ে তপতী কে সেই ভাবে সময় দিতে পারে নি। এমনকি রিনি কে পযন্ত সময় দিতে পারে না। শুধু কি সময় ? পেটের খাবার, পোশাক,আর মাথার ওপর ছাদটুকুর বাইরেও একটা মেয়ের যে আরও কিছুর চাহিদা থাকতে পারে সেটা একদিনের জন্যও সৌমেন বোঝেনি। তপতী অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কান্নাকাটি, অশান্তি ঝগড়া, অভিমান কিছুই বাদ যায় নি। কিন্তু সৌমেন এতটুকু পাল্টাইনি। উল্টে তপতী নিজেই অনেক খানি পাল্টে গেছে। সাফোকেটিভ সৌমেনকে জীবনের খোলা জানালাটুকু থেকে সযত্নে সরিয়ে রাখে আজকাল ।

    অবশ্য অভিরূপ না থাকলে হয়ত সে তার নিজের চাহিদাগুলো পাল্টে ফেলতে পারতো না। আজ তিন-তিনটে বছর হয়ে গেল অভিরূপের সাথে সোশাল মিডিয়াতে পরিচয় হয়েছে।  ব্যাচেলর মানুষ। চাকরিসূত্রে থাকে দিল্লিতে। এইমস এর ডক্টর। রোজ মানুষটার সাথে ভার্চুয়ালি কথাবার্তা হলেও সামনাসামনি কোনো দিনও দেখা হওয়ার সুযোগ হয় নি। অত দূরে থেকেও অভিরূপ কত সুন্দর তপতীর চাওয়া-পাওয়া, কষ্ট- দুঃখ , মন খারাপ সব বুঝতে পারে। অথচ  সৌমেন ওর সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়েও ওর মনের কোনো খবরই রাখলো না। একদিন গল্প করার সময় অভিরূপ বলেছিল এই শংকর পুর গ্রামে না কি ওর কোন আত্মীয় থাকে। এত তাড়াহুড়ো করে ওরা চলে এল যে একবার বলে আসারও সুযোগ পায় নি। আজ রাতে কথা বলার সময় আত্মীয়র ঠিকানাটা একবার জেনে নেবে ভাবলো  ।

  এই সব ভাবতে ভাবতে কখন মঠের কাছাকাছি চলে এসেছে খেয়াল করে নি। একটি খুব চেনা পুরুষ কন্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ায়। পুরুষ কন্ঠটি কাউকে যেন শাসন করছে। " রাজদীপ দাঁড়াও বলছি। মামন আমি তোমাকেও দাঁড়াতে বলেছি। এত জোরে সাইকেল চালাবে না পড়ে যাবে। এই রকম দুষ্টুমি করলে আর কোনো দিন দাদু-ঠাম্মির কাছে নিয়ে আসবো না "। শিশু দুটি ছোট্ট ছোট্ট দুখানি সাইকেল চালিয়ে ওর সামনে দিয়ে চলে গেল। তপতী পিছন ঘুরে দাঁড়াতেই পুরুষ কন্ঠটিও থমকে দাঁড়ায়। আর চিনবে নাই বা কেন? তিন বছরের ভার্চুয়ালি সম্পর্কে তারা তো পরস্পরের কাছে কিছুই গোপন রাখে নি । 

সেই মুহূর্তে শিশু দুটি পিছন থেকে বলে উঠল "পাপা তুমি কি আমাদের কাছে হেরে গেছো?"

F

Final Exposer

Final Exposer এর রিপোর্টার