কবিতা ✍ Final Exposer

সত্যিই ভয়

সত্যিই ভয়

পূজা দাস বোস (কলকাতা)

উফ আজ কি সব লোক একসঙ্গে এই ট্রেনেই উঠেছে-নাকি, পা রাখতে পারছি'না।
আর বলবেন'না একেই বনগাঁ তার উপর লেট, ভিড়'তো ডবল হবেই।
এই দেখি একটু সাইড দিন'না আমি নামবো উফ, প্রাণটা বেড়িয়ে গেল! আজ দিনটা বড়ো খারাপ গেল সকাল থেকে।
একি কোথায়…
কেউ নিতে এলনা'তো বলেছিল আসবে ! ফোনের চার্জ'টাও যে শেষ। মনে হয় দেরি দেখে চলে গেছে।
হয়তো ভেবেছে আজ আর আসবো না। কত অন্ধকার রাস্তাটা… বোধহয় কারেন্ট নেই!
একা একা কি করে যাবো বাড়িতে' কাউকে দেখতেও পাচ্ছি না।
ওই'তো একজন… না-না বেশ কয়েকজন লোক দুজন মহিলা'ও আছে। যাই ওদের পিছু নিই।
এই যা এরা তো আমার পাড়ার কেউ না! একি এরা যে রেললাইনের পথ নিল, এবার কি হবে!
থাক যাই… কিন্তু যদি শেষ রাস্তা পর্যন্ত এদের কেউ না যায়, আমি বাড়িতে কি করে যাবো।
সত্যিই আমার না ভীষণ ভয় ! এইতো এইটুকু রাস্তা লাইন ধরে একটু এগিয়ে পাড়ায় ঢুকে যাবো।
এদের সঙ্গেই যাই…এই যা এরা সব এই রাস্তায় নেবে গেলো', এখনো তো ওই ওখানে লাইনের পাশে ভুত গাছটা এলোই না! আমি এখন কি করবো… হে গোবিন্দ রক্ষে করো।
ওই তো দূরে দাড়িয়ে সেই ভুত গাছটা…উফ একটা মানুষের মত! না-না এত বড় মানুষ! ধ‍্যাত ওসব কিছু না, রাতের অন্ধকার তার উপর ঘন কুয়াশা নিজেকেই ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিনা, সাতটার গাড়িতে নামলাম কে বলবে মনে হচ্ছে যেন মাঝ রাত।
গলাটা শুকিয়ে গেল কেন…… হঠাৎ? ভীষণ ভয় করছে ওই যে সেই গাছটা কুয়াশার মধ্যে কেমন একটা লাগছে দেখতে..!
আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে রাস্তার দুটো বাড়ির পরে সেই দিদিটা… ওখানেই তো সুইসাইড করেছিল ট্রেনে।
সবার মুখে তখন ওর কত কথা শুনেছি কিন্তু আগে কখনো ওকে দেখিনি, হয়তো দেখেছি আমি চিনতাম না।
তবে মরে যাবার পর ওর এত কথা শুনেছি, যে একটা পরিচিত আবছা মুখ দেখতে পেতাম। কতদিন বারান্দায় হেরিকেনের আলোয় বই পড়তে বসে অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে কল্পনায় কত বার ওকে এখানে দেখেছি। সত্যিই কি কল্পনা শক্তি আমার! ক্লাস ফাইভে, ভাবলেই হাসি পায়। বাড়ি থেকে দশ মিনিট লাগে রাস্তা ফেলে রেল লাইনের পাশের ওই ভুত গাছের কাছে যেতে। আর আমি বাড়িতে বই পড়তে বোসে এসব দেখছি, মনে মনে ছবি এঁকেছি।সত্যিই আমি না একটা যা তা ছিলাম ছোট্ট বেলায়। উফ এখনো তাই আছি না হলে এত ভয় পেতাম অকারণে। কি অপূর্ব মুগ্ধময় এই রাত,কি অপূর্ব ওই কুয়াশা মাখা চাঁদ।
এখন তো আমার সেই তাকে মনে পরার কথা যাকে এখনো পাওয়া হয়নি।

"তোমার জন্য কাটিয়েছি বহু রাত অলিখ স্বপ্নে ,
আজ যদি আসতে এই পথে এই সময়,
এমন নির্জনে"।

তা না যারা পৃথিবীতে নেই, জীবন যুদ্ধে হেরে এভাবে মুক্তি নিয়েছে। উফ মুক্তি তো নয় আরও যন্ত্রণা, আমি ঘৃণা করি ওদের। কিন্তু কোথায় এই মুহূর্তে যে শুধু ভয় গ্ৰাস করছে আমায়, এই বুঝি গিলে ফেললো অর্ধেক চন্দ্রের মত।
না না এসব ভাববো না। রাম রাম রক্ষে করো আজকের মত।
আর ফোনে চার্জ না দিয়ে বের হবনা। ওরাই বা কেমন, একটু না হয় দেরি হয়েছে আমার জন্য একটু দাঁড়ালো না…আমাকে কেউ ভালোবাসেনা, আজ বাড়ি গিয়ে মার সঙ্গে একটাও কথা বলবো না একটাও না! সে থাকুক তার ছোটোমেয়েকে নিয়ে।

কিন্তু আজ এই রাতে আমার বাড়ি যাওয়া সত্যিই হবে! মনে হচ্ছে কত গুলো ছায়া গা ঘেঁষে চলতে চাইছে, ও মা তুমি কোথায়, কেন একটু দাঁড়ালে না।না আর ভয় নয় অনেক হয়েছে ভুত বলে কিছু হয়না, যারা বেঁচে থাকতে ওমন স্বেচ্ছায় ভুত হওয়ার সহজ পথ নিয়েছে, তারা মরে গিয়ে ঘন্টা করবে।

এই তো এই দু'নম্বর রেলপাড়। এখানেই তো সেই দূর পাড়ার কোন বৌ দু'টো বাচ্চা নিয়ে সুইসাইড করেছিল। না না বড় বাচ্চা'টা মায়ের হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল ট্রেন দেখে ….
কোলের বাচ্চা টা মায়ের সঙ্গে উফ…… এখানে শুনেছিলাম জুতো পড়ে ছিল।
আমি আর হাঁটতে পারছি না এতটুকু রাস্তা শেষই হচ্ছে না! আমার স্পষ্ট মনে আছে ছোট্ট বেলায় আমার খুব কষ্ট হয়েছিল এই বাচ্চাটা আর ওর মায়ের জন্য। আমি ভগবানকে বলেছিলাম বৌটা যেন এক ভয়ংকর পেত্নী হয় আর ওর মাতাল বর'টার হাড়গোড় সব ভেঙে দেয়।
আচ্ছা ওরা সবাই আমাকে দেখছে তাই না? এই কুয়াশার চাদরে ঢেকে রেখেছে নিজেদের! সব প্রেতাত্মাগুলো মনে হয় দল বেঁধেই আছে, আচ্ছা ওরা যখন আমার মত বেঁচেছিল তখন ওরাও তো ভুত ভয় পেত! এখন সুযোগ পেয়েছে যদি ভয় দেখায়, এখন যদি প্রতিশোধ নেয়! না না আমি তো কখনো কারো ক্ষতি করিনি। কিন্তু তা ওরা কি করে জানবে! আমাকে তো এরা কেউ চেনেনা!
আচ্ছা আমি কি এখানে শুয়ে পড়েছি, না বসে আছি! না না এই তো আমি হাঁটছি, পাঁচ মিনিট'ও না এইটুকু রাস্তা এত কেন সময় লাগছে!
আমি কি সামনে এগিয়ে এলাম ! হ‍্যাঁ তাইতো একি সর্বনাশ আমার পাড়ায় ঢোকার রাস্তায় না নমে আমি যে লাইন ধরে হেঁটে এগিয়ে এলাম।
ওটা কে মানুষের মত কেউ না! একি কেমন ছায়া ছায়া কোথায় মিলিয়ে গেল! আমি চিৎকার করতে পারছি না কেন!
এই তো এই খানে আমার পায়ের সামনে সেই ছেলেটার মুন্ডুটা ছিল, ওইখানে নিচে ধরটা, আর ওর প্রেমিকা তার বডি ওখানে …
এসব কি ভাবছি! আমি কি করবো ? হ‍্যাঁ চিৎকার…..কিন্তু কোথায় গলায় কোনো স্বর নেই কেন ?
আমি কি হাঁটছি…. না না পেছনে ফিরতে হবে। রাম রাম গোবিন্দ তুমি রক্ষে করো আর কিছু ভাববো না, রামো রামো এই তো এতক্ষণে….. দুনম্বর থেকে এক নম্বর রেল লাইন পার হলাম,
এবার দৌড়….. এতটা সময় যেন পাদুটো আমার নিজের ছিল না ,এখন যেন ঘাম দিয়ে শরীরে শক্তি ফিরে এলো । এক নিঃশ্বাসে পাড়ার মধ্যে দিয়ে দোকান রাস্তা ফেলে একে বাড়ে বাড়িতে এসে নিঃশ্বাস ছারলাম ,সমস্ত পাড়া যেন এরমধ্যেই শীতের কুয়াশায় ঘুমিয়ে পরেছে, পাঁচ মিনিটের রাস্তা এক মিনিটে দৌড়ে এলাম,উফ এতকোষণ এই শক্তি আমার কোথায় ছিল।

কি হয়েছে কি হয়েছে একরাশ প্রশ্ন ,কোন ট্রেনে এলি ফোন বন্ধ কেন? আমি কারো কোনো কথায় তেমন উওর করতে পারলাম না সে রাতে, মা লোহা পোড়া জল খেতে দিয়ে ছিল , ভাত বোধহয় খাইনি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘুম আসতে অনেক সময় নিয়ে ছিল, অনেকটা সময়।

কি আশ্চর্য ক্লাস 6 একবার পাকামি করে বন্ধুদের সঙ্গে রেল লাইন ধরে বাড়ি ফিরেছিলাম । মাঠের রাস্তায় বা বড় রাস্তা দিয়ে না এসে , এমনটা করতে পারি যেনে আমাদের সবার মা দাঁড়িয়ে ছিল সাবধান করতে ।
তবে লাইনের ওপারে আমরা আসছিলাম দু নম্বর দিয়ে। গল্পে এত মন ছিল যে … পথে এত লোকজন এত কি ফিসফিস কথা কেমন একটা ভারি হাওয়া কিছুই নজরে এলোনা ।
দূর থেকে দেখছি সবার মায়ের সঙ্গে আমার মাও বলছে ওদিক দিয়ে পার না হতে। কিন্তু কৌতুক বশত সোজা হেঁটে গেলাম। আমার সঙ্গে আমার মত অবাধ্য দুজন সঙ্গী ছিল। লম্বা লম্বা পা ফেলে একটু এগোতেই আমাদের সামনে সেই মুন্ডু ।
তিন জন হঠাৎ দেখে চিৎকার করে নিচে নেমে পড়লাম। আবার চিৎকার করে এক দৌড়ে যে যার মায়ের কাছে।
সেই থেকে আমি কখনো এমন অযাচিত নৃশংস নির্মম ডেডবডি দেখিনি।
তবে এমন ঘটনার যত গল্প শুনতাম সবার মুখে, তাতে সবটা দেখতে পেতাম কল্পনায় ছবির মত।
ভয়'হত, কষ্ট'ও হত! মাঝে মাঝে ভাবতাম কেন ওরা সুইসাইড করে! ওদের কি ভয় করেনা!

F

Final Exposer

Final Exposer এর রিপোর্টার