কবিতা

চিন্ময়ী

রমা চোঙদার (কলকাতা)

(এক নারীর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের অস্ত্বিত্বের স্বীকৃতি অর্জন করার কথা জেনে সোমাকে চিন্ময়ী রূপে আবিষ্কার করে, আমার অক্ষরমালায় সাজালাম !)

আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে আলোর বীজ ঘুমিয়ে থাকে, সাধনার দ্বারা তাকে জাগাতে হয়, কিন্তু কঠোর সাধনার কাজ খুব সহজসাধ্য নয়, একজন সাধুর একমনে আত্মখনন করা যতটা সহজ, একজন সংসারী মানুষের আত্মমগ্ন হওয়া ঠিক ততটাই কঠিন ! কিন্তু যার ইচ্ছেশক্তি প্রবল সে হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের অন্তরের আলোর বীজকে একটু একটু লালন করে !
সময়ের সাথে সাথে সেই আলোর অঙ্কুরের চোখ ফোটে ! তখন সেই আলো দেবশিশুর মতো ভিতরে ভিতরে খেলা করে আত্মাকে আনন্দ দেয় !
হৃদয় উৎসারিত আলোর খেলায় যখন মানুষ মেতে ওঠে, তখন সে ঋষির পর্যায়ে পৌঁছে যায় ! এবং আত্মমগ্নতার মধ্য দিয়ে নিজের মনের অজান্তে সে কখন নিজেই স্বয়ং ব্রহ্ম হয়ে ওঠে !

বিষ্ণুপুরের মাটিতে লালিত আজ এক খ্যাতনামা চিত্রশিল্পীর সাথে পরিচয় করাবো , যার নাম আমি রেখেছি চিন্ময়ী !

যে চিন্ময়ী কখনো পেয়ারা গাছে উঠে পাতার ফাঁকে মুখ লুকিয়ে , রোদ্দুরের আলোছায়ার সাথে খেলা করে , কখনো কাজলা দিঘির পাড়ে বসে পদ্মপাতায় ফড়িং- এর ওড়াউড়ি দেখে বিহ্বল হয়, কখনো নীলাকাশে রামধনুর রং মনের ক্যানভাসে আঁকে, কখনো এলোচুলে কপালকুণ্ডলার মতো বনে -জঙ্গলে আপনমনে ঘুরে বেড়ায় !

একদিন উড়িষ্যা থেকে আসা এক রাজপুত্তুর
চিন্ময়ীর হৃদয় জয় করে নেয় !

বনের পাখিরা , গাছের ছায়া, বনফুল, নীলাকাশ সকলে চিন্ময়ীর কানে ফিসফিস করে বলে -- বন্ধু মন খারাপ কোরো না , আমরাও তোমার সাথে, সাথে যাবো বন্ধু !

শ্বশুরমশাই , স্বামী , এবং ধীরে ধীরে দুই সন্তানের জন্ম, চিন্ময়ীর ভরা সংসার !
বড় ছেলের স্কুলের প্রিয় টিফিন , বিজ্ঞানী স্বামীর ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিসের রান্না, বৃদ্ধ শ্বশুর মশাই-এর পাঞ্জাবি কেচে, ইস্ত্রি করে সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা, চিন্ময়ী সংসারের সমস্ত দায়দায়িত্ব একা হাতে হাসিমুখে সামলায় !

তারপরেও শ্বশুর বাড়িতে ফাঁকা জায়গা দেখে ফুল, ফলের বাগান করে, নিজের হাতে পরিচর্যা করে !

ভোরের নরম আলোয় চিন্ময়ী আলতা পায়ে নুপূর পরে , যখন বাগানে কচিকচি দূর্বাঘাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে যায় , তখন মেঘলা চুলে দু-একটি শিউলিফুল টুপটুপ ঝরে পড়ে !
চিন্ময়ীর হৃদয় তখন স্বর্গীয় সুখে বিভোর হয়ে যোগিয়ার আলাপ ধরে !

সংসার সাগরে সাঁতার কাটতে কাটতে দিন চলে যায় ! তবুও বাগানে নিজের হাতে লাগানো কলা গাছের মোচা কেটে এনে ,ছাড়িয়ে , মোচাঘণ্ট রান্না করে , পরিবারের সকলকে খাইয়ে, তাদের তৃপ্তির মুখ দেখে চিন্ময়ীর চোখ খুশিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে !

চিন্ময়ীর আঁচলছায়া পরিবারের সকলের কাছে শান্তির আনন্দ আশ্রম !
এরই মধ্যে ঝড়, বৃষ্টি, বাস্তবের দাবদাহে সময়ের কামড়ে চিন্ময়ীর শরীরে তিন, তিনবার কাটাছেঁড়া চলে , তবুও মনের চালিকাশক্তি দ্বারা জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে , নিজের আরাধনায় নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করে !

কারো মা, কারো বউমা, কারো স্ত্রী তার বাইরে বেরিয়ে দিনান্তে চিন্ময়ী নিজের সত্তার মুখোমুখি হয় !

বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লে চিন্ময়ী একলা ক্যানভাসের সামনে সাধনায় যখন মগ্ন, তখন হঠাৎ রাতের নিঃস্তব্ধতাকে খানখান করে চিন্ময়ীর ঘুমন্ত শিশু মাঝেমধ্যে উমা উমা বলে কেঁদে ওঠে !

চিন্ময়ীর ধ্যান ভেঙে যায় , ফিরে তাকায়, রং, তুলি, ক্যানভাস ফেলে তাড়াতাড়ি আত্মজকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের স্নেহধারা পান করিয়ে ঘুম পাড়ায় ! তারপর মাতৃসত্তা থেকে বেরিয়ে এসে আবার শিল্পসত্তার মধ্যে চিন্ময়ীর অবগাহন !

দিনরাত্রির অক্লান্ত পরিশ্রমকে উপেক্ষা করে এইভাবেই সাধনার সোপান ছুঁয়ে ছুঁয়ে চিন্ময়ী সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে ওঠে!
পাহাড় , নদী , সমুদ্র , গাছপালা, প্রজাপতি , চাঁদ, তারা, ফুল, পাখি প্রকৃতি, পৃথিবীর সমস্ত রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণের সাথে তখন একাত্ম হয়ে ওঠে ! দিব্যদৃষ্টির বিচ্ছুরিত আলোয় চিন্ময়ীর আত্মা তখন পরমাত্মাকে নিবিড়ভাবে অনুভব করে সচ্চিদানন্দে ভেসে যায় !
ভালোবাসার সিঞ্চনে সৃষ্টিতে প্রাণ সঞ্চার করে, চিন্ময়ীর হঁঁশ ফেরে !

আকাশের মিটিমিটি তারারা একে একে হারিয়ে যায় !

ভোরবেলায় টানটান হয়ে যাওয়া শরীরটাকে চিন্ময়ী বিছানায় এলিয়ে দেয় !
খোলা জানালা বেয়ে রাঙা সূর্যের আলো চিন্ময়ীর চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়তেই , মুঠোফোনটা বেজে ওঠে !

---- সুপ্রভাত ম্যাডাম !
আপনি উড়িষ্যার পেইন্টিং ওমেন এচিভার পুরস্কারে সম্মানিত ! আন্তরিক অভিনন্দন জানাই !

আনন্দে চিন্ময়ীর চোখের পাতায় শরতের শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ে….