রকমারি মা

মালবিকা পণ্ডা (পশ্চিম মেদনীপুর)

    রবিবার। বেশ কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে আড্ডা মারছে। অঙ্কিত এখনও আসে নি । আড্ডাটা যেন ঠিক জমছে না।

অঙ্কিতের আড্ডার জায়গায় পৌঁছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। বাকিরা সবাই রে রে করে তেড়ে এলো।

“তোর এতো দেরি কেন রে অঙ্কিত?”
অঙ্কিত ধপাস করে বসে পড়ে বলল, “আরে বেরিয়ে ছিলাম। ঠিক সেই আমার মাতৃদেবীর ফরমাশ শুরু হলো। ‌”কোথায় যাচ্ছো? তাড়াতাড়ি ফিরবে। আসার সময় পাড়ার দোকান থেকে কেজি পাঁচেক আলু আনবে।”

  উফ্ ! একটা দিন । তাও শান্তি নেই। রবিবার ছুটির দিন। সবাই আড্ডা মারবো তারও উপায় নেই। জানিস, প্রতিদিন মুখের গন্ধ শুকবে। সিগারেট খেয়েছি কিনা । ভাবতে পারিস কেমন মা আমার।" 

 সঞ্জয় সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলল, "তোর মা তো কম বলেছে। আমার মা কি বলেছে শুনবি? মাথায় আগুন জ্বলে যাবে শুনলে। আমি ঘুম থেকে উঠতে দেরি করেছি। উঠেই মায়ের রক্ত চক্ষু। "নবাব পুত্তুরের ঘুম ভাঙ্গলো। আমি ভাবলাম চাকরি পেয়ে সাপের পাঁচ পা দেখেছো। যাও এবার আমাকে উদ্ধার করো । দাঁত মেজে চা টা খেয়ে নাও। আমি তো দাসী বাঁদী আছি তোমাদের চা, খাবার নিয়ে বসে থাকবো।  আজ মাতৃ দিবস সকালে উঠে মাকে একটা প্রণাম পর্যন্ত 

করলি না।”
আমি লজ্জায় জিভ কেটে মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “ভুলে গেছি মা ক্ষমা করে দাও। তারপরে মাকে প্রণাম করতে গেলে পা সরিয়ে নিয়ে বলল, থাক আর প্রণাম করতে হবে না। মাতৃ দিবস মনে থাকে না কিন্তু প্রেমের দিন গুলো ভালোই মনে থাকে। তখন তো লাল গোলাপ, হলুদ গোলাপ সব কেনা হয়ে যায়। চকলেট, টেডি কিছুই বাদ যায় না। শুধু মায়ের বেলায় মনে থাকে না। বিয়ের পর মা বলে কেউ ছিল এটাই তোর মনে থাকবে না।” এবার বল কার মাথার ঠিক থাকে।
:অরণ্য মুচকি মুচকি হাসছে সব শুনে। সঞ্জয় অরণ্যর হাসি দেখে খুব রেগে যায়।

    অরণ্য মুচকি হেসে বাঁ হাতের জামার আস্তিনটা তুলে দেখালো লাল দাগ হয়ে গেছে। দেখ ভালো করে। কাল মায়ের কাছে পেয়েছি। দেখতে রোগা পটকা কি গায়ের জোর। মুখের উপর কথা বলে ফেলেছি। মাইরি মুড়ো ঝাঁটা দিয়ে মেরে লাল করে দিল। মাঝে মাঝে মনে হয় বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই। দেখবি এখনই ফোন আসবে।  বলতে বলতে অরণ্য র মায়ের ফোন । "কোথায় আছিস ? ফিরতে দেরি যেন না হয়। যেখানে বসে আছিস সেখানে ঝোপঝাড় নেই তো? এখন মশার উপদ্রব । এখন আবার সাপও বেরোচ্ছে।" স্পিকার অন করে সবাইকে শুনিয়ে বলল, "দেখছিস তো অবস্থা আমার!" মেরে লাল করে দিল। আর ঘর থেকে ‌একটু বেরোতেই ফোনে সাবধানতার বাণী। মা গুলো এই রকমই হয় মনে হয় ।"

  অর্জুন নামের বন্ধু টি মুখ নিচু করে চুপচাপ বসে আছে। কারো সঙ্গে একটাও কথা বলে নি। অর্জুনের সঙ্গে বছর দুয়েক হলো বন্ধুত্ব হয়েছে।  অর্জুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,"তোমরা খুব ভাগ্যবান। এই রকম মার, গালাগালি, বকুনি খাবার জন্য একজন "মা" দরকার হয়। যেটা আমার নেই । তোমরা বাড়িতে দেরি করে গেলে খুব বকা খাবে, হয় তো মারও খেতে পারো। আবার খাবার সাজিয়ে তোমাদের কাছে এনে  খাইয়েও দিতে পারে। আর আমি যদি রাতের পর রাত বাড়িতে না ফিরি শাসন করার মতো কেউ থাকে না। ভুল করলে মুড়ো ঝাঁটা, বেলন দিয়ে মারার কেউ নেই।  আজ মা দিবস।  খুব আবছা মনে পড়ে মাকে। বাবাই এখন আমার সব। অভাব কিছু নেই। তবুও যেন মন ভরে না। কিছুর একটা অভাব বোধ করি। হয় তো গালাগালি, বকুনি  জুতোপেটার অভাব বোধ করি। সবসময় মিষ্টি খেতে খেতে মুখটা কেমন হয়ে যায়। তখন একটু টক, ঝাল, তেতো খেতে খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু পাই না।"

অর্জুনের কথা গুলো শুনতে শুনতে চোখে জল এসে যায় তাদের।

“জানো তো , মাকে বোঝার ক্ষমতা স্বয়ং ভগবানের নেই। এঁরা কখনও উগ্র চন্ডা। কখনও ধূমাবতী। কখনও কালিকা, আবার কখনও মা দুর্গা। এরা যা কিছু করে সবটাই সন্তানের মঙ্গলের জন্য করে। এঁরা সন্তানের জন্য সব ত্যাগ করতে পারে কিন্তু কোনো কিছুর জন্য সন্তানকে ত্যাগ করতে পারে না ।” আমাদের দেশের জন্য যেমন বি আর আম্বেদকরের একটা সংবিধান আছে তেমনি সন্তানদের জন্য মায়েদের একটা সংবিধান
আছে। কি করতে হবে আর কি করা যাবে না সব বলা আছে। সেটা মেনে চলতেই হবে না হলে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তি পেতে হবে। এই হল “মা”। রকমারি মা। তাদের ভালোবাসার ধরণটা আলাদা। শাসনের পন্থাটাও আলাদা। মুখে বলবে “মর মর”। কিন্তু পায়ে যদি একটা কাঁটা ফুটে যায় সন্তানের তাহলে ত্রিভূবন কাঁপিয়ে তুলবে।

    এই হল মা । সন্তানের বয়স যখন আশি হয়ে যাবে তখনও মা ভাববে আমার সন্তান ছোটটিই আছে। সন্তানের জন্য একা একটি মা কোর্টে লড়াই করে স্বামীর বিরুদ্ধে। মায়েদের তল পাওয়া যায় না, মহাসাগরের মতো। 

 এবার আমাকে উঠতে হবে। আমি যাই তোমরা গল্প করো। অর্জুন চলে গেল। সঞ্জয়, অঙ্কিত, অরণ্য চুপ হয়ে গেল অর্জুনের কথা শুনে।  কিছুক্ষণ বসার পর সঞ্জয় বলে, চল এবার ওঠা যাক। দেরি হলে মনে হয় জুতোপেটা করবে আজকেও। আজ মাতৃ দিবসেও ছাড় পাওয়া যাবে না। মায়েদের একটা সংবিধান আছে তো। তার বাইরে যাওয়া যাবে না। 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *