ভাত ঘুম

শ্রাবণী মুখার্জী (বাঁকুড়া)

শুনছো বলি শুনছো…কুথায় গ্যালে গ বিল্টুর বাপ?
উফফ কাজের দরকারে মানুষটাকে কোনদিন পাওয়া গেল না গ, কি করি ইবার ?
বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বিশ্বরূপ সরকার।
বলি হইছে টা কি? এই ভর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই এতো চেললামেল্লি করছ ক্যানে? শেষে নিশ্চিন্তে একটু ইয়েও করতে পারব না তোমার জ্বালায়?

হাতের ব্যাগটা চেয়ারে ছুঁড়ে সীতা বলল আরে ভূমিকম্প হইচে ভূমিকম্প জানো, আমি sir হলাম গ। ইবার কি করব?
বিশ্বরূপ খানিক ভ্রু কুঁচকে জড়ো হওয়া চোখে তাকিয়ে কি করে হবে ? তুমি অঙ্গনওয়াড়ির হেল্পার ছিলে, কানাইকাকুকে তেল মালিশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিদিমনি হলে চার বছর,
হেল্পার থেকে দিদিমনি তাও ভাবা যায়, ট্যারা চোখে তাকিয়ে কিন্তু দিদিমনি থেকে স্যার? লিং পরিবর্তন? সম্ভব সেটা?

সীতা খানিকটা দূরে সরে গিয়ে মুখ হাঁ করে তাকিয়ে বললো হ গ, সেটাই তো বলচি। জানো দেশ জুড়ে চলছে নাকি এখন “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” না কি যেন বলছে বাবা। আমি ভয়ে কুঁকড়ে ছিলাম তখন,তাই ভালো করে শুনি নাই। তবে এই সামনের মাস থেকে আমাকে কাজে লাগতে হবেক, আজ ইশকুলে চিঠি এলো। হেডদিদিমনি বলল ‘সীতা সরকার আপনাকে কাল থেকে sir এর কাজ করতে হবে’। বলেই ভ্যা করে কাঁদতে শুরু করলো সীতা সরকার,

ইন্দিরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমি কিন্তু আমার যে গড়ায় গলদ কি কইরে বইলব ভেবে পাচ্চি না।” জানো আবার অনলাইনে পাঠাতে হবেক, কি কি কাজ করেচি সেগুলান। বলি হ্যাঁ গ বিল্টুর বাপ, একি ফ্যাসাদে পড়লুম বলো দিকি। একটা কুনো বুদ্ধি বেইর করোগ, যাতে সাইপও মরে আর লাইঠিও না ভাইঙ্গে, বলি অগ বিল্টুর বাপ শুনচ আমার কথা?

বিজ্ঞের মতো মাথা দুলিয়ে বিশ্বরূপ বলল হুম,এইবার বুঝলাম তুমাকে ‘বি এল ও’ করেছে।
সীতা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল হ হ ওই ‘বিএলো’ কেএলো গুষ্ঠির ষষ্ঠী পুজা করতে
বিশ্বরূপ বলল খুবভালো এই কাজের জন্য আঠারো হাজার টাকাও পাবে। এতোদিন স্কুলে গিয়ে ভাতঘুম দিতে দিতে তুমার শরীরে মেদ জমে গেছে, এবার টুকুন ছিলিম হবে গো গিন্নী।
তবে তুমি চিন্তা করো না ম্যায় হুঁ না?

সীতা মুখের ভাঁজ একটু কমিয়ে বলল কি বলছ গ, এই কাজের জন্য আঠারো….?

হ্যাঁ গো আমার রোজগেরে গিন্নী! বলেই টুকুস করে চিবুক ছুঁয়ে চুম্মা খেয়ে বলল
SIR মানে হলো ….

আরে রাখো তোমার মানে, ইদিকে আমার ভয়ে হাত পা সেঁধিয়ে গেলো আর উনি এখন ডিসকেনারির মানে খুঁজতে লাগলেন
বিশ্বরূপ এক চটকা হো হো হেসে বলল ওটা ডিকশেনারি
গাল ফুলিয়ে সীতা বলল ওই হলো, বিল্টুর ছাত্রবন্ধু। তুমিই যেন সব জানো!
বিশ্বরূপ কৌতুকরঙ্গে বলল হ্যাঁ অবশ্যই জানি আমার নাম জানোতো বিশ্ব-রূপ, মানে সারাবিশ্বের সবরকমের রূপ জানি। আবার আমার পদবী সরকার অর্থাৎ আমিই দেশজুড়ে…
সীতা মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল হ তুমিই হত্যাকর্তা।

আঁতকে উঠে ভ্রু কপালে তুলে বিশ্বরূপ বলল চুপচুপ গিন্নী, একি বলছ?
হত্যাকর্তা নই তবে আমি হরতা করতা বিধাতা বলতে পারো।

ডিউটি ইজ ডিউটি বুঝলে,তোমাকে একাজে আমিই সাহায্য করব। ঘাবড়ে যেও না। কত্ত কষ্টে কানাইকাকুকে পলকিয়ে চাকরিটা পেয়েছ এতো সহজে ছাড়ব না
তাই সরকার মানে আমিই তোমাকে খাটানোর জন্যই এই কাজের ব্যবস্থা করলাম। কিন্তু…বাপেরও বাপ থাকে আইনেরও ফাঁক থাকে বুঝলে গিন্নী। আজরাতে…. প্যালেনটা বলব কানে কানে।

থাইক তুমাকে কাইনে বইলতে হবেক নাই, বুজে গেচি আমাকে কি কইরতে হবেক। শরীর খারাপের এক্টিং কইরে হাসপাতালে জায় সুইয়ে দেব।
তাইলে ইটর থেইকে বেইচে যাব- চাকরটাও..

বাংলার পাঁচ মুখ করে সীতা বলল ইস্কুলের ভাতঘুমটা গেল, পুরো বারোটা বেজে গেল।

বারোটা বেজে গেল গিন্নী ? তাইলে….

আঃ মরণ! বুড়ো ভামের কথা শুনো, কি বল্লাম আর কি মানে করলেন।

হাহাহা হেসে বিশ্বরূপ বলল এহচ্ছে গিয়ে ধান ঝাড়াই মাড়াই বুঝলে গিন্নী, ধানের থেকে আগড়া বের করতে হবে। সেদিন দেশ পত্রিকায় একটা আর্টিকেল পড়লাম খুব দামি কথা লিখেছিল।

সীতা বলল আগড়া ঝাড়তে গিয়ে নিজেরাই না…
কাজ না করে করে এই হাল।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *