মৌমিতা মৌ (কলকাতা)

মেয়েটা প্রতিদিন ঠিক সূর্য নামার আগমুহূর্তে সমুদ্রের ধারে আসে।
যেন ভাঙা দিনের শরীর থেকে একটু একটু করে নুন ঝরিয়ে নিতে আসা জলের কাছে।
হাতে তার খাবারে ভর্তি বালতি আর কাপড়ের ব্যাগ..
কোনো দামি ব্র্যান্ডের অহংকার নেই সেখানে,
শুধু শুকনো বিস্কুট, ভাতের গন্ধ, আর বেঁচে থাকার ক্ষুদ্র দায়িত্বগুলো গুছিয়ে রাখা পেলবতায়।
দূর থেকে দেখলে মনে হয়,
সমুদ্রের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা বাতিঘর।
যার আলো মানুষের জন্য নয়..
পেটের খিদেয় কাঁপতে থাকা বায়স-দের জন্য,
বৃষ্টিভেজা সারমেয়-গুলোর জন্য,
যারা সভ্যতার সার্কাসের বাইরে পড়ে থাকা ছেঁড়া টিকিটের মতো বেঁচে আছে।
মেয়েটাকে কখনও হাসতে দেখিনি খুব,
আবার কাঁদতেও নয়।
তবে সদানন্দে ভাসতে দেখেছি..
মুখে তার এক ধরনের প্রশান্তি লেগে থাকায়!
যেমন বহু ঝড় পেরিয়ে যাওয়া সমুদ্রের বুকেও
শেষমেশ একরকম স্থির নীল রঙ জন্মায়।
প্রথমদিন ওকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম…!
এই সময়ে, যেখানে মানুষ নিজেকেই ভালোবাসতে শেখে না,
সেখানে একটা যুবতী মেয়ে প্রতিদিন
নিজের ভাঙাচোরা মনকে খাবারের সঙ্গে ভাগ করে দিচ্ছে কিছু অবহেলিত প্রাণের মধ্যে!
ভাবছিলাম–
কোন দহন তাকে এমন করেছে?
কোন বিশ্বাসঘাতকতা তাকে মানুষের ভিড় থেকে সরিয়ে এনে
পাখি আর পথকুকুরের চোখে আলো খুঁজতে শিখিয়েছে?
তারপর একদিন বুঝলাম,
সব মানুষ নিজেকে শেষ করে না দড়িতে ঝুলিয়ে..
কেউ কেউ ধীরে ধীরে বলিষ্ঠ হয় মানুষের নিষ্ঠুর ব্যবহারে,
অপমানের পুনরাবৃত্তি’তে, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় কঠিন প্রত্যয়ে
অপেক্ষার মরচে পড়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে।
আর এই মেয়েটা..
সে হয়তো মৃত্যুকে হারানোর জন্যই
প্রতিদিন সমুদ্রের কাছে আসে।
কারণ সমুদ্র কাউকে প্রশ্ন করে না,
কারো অতীত ঘেঁটে নুনলঙ্কা ডলে দেয় না।
সে শুধু ঢেউ পাঠায়,
যেন বলে–
“যা কিছু ভেঙেছে, তা নিয়েও বেঁচে থাকা যায়।”
এখন আর মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা হয়না, অনুপ্রাণিত হই একাকিত্ব ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে এভাবেও বাঁচা যায়!..
তার চারপাশে উড়তে থাকা বায়সগুলো যেন কালো রঙের প্রার্থনা,
সারমেয়গুলোর নাড়তে থাকা লেজ যেন পৃথিবীর শেষ বিশ্বাসটুকু।
মেয়েটা হয়তো প্রেম পায়নি,
সংসার পায়নি,
অথবা পেয়েও হারিয়েছে।
তবু সে মৃত্যু বেছে নেয়নি..
নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বদলে
নিজেকে একটু একটু করে ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষুধার্ত প্রাণগুলোর মধ্যে।
আজকাল তাকে দেখলে মনে হয়–
মানুষ আসলে তখনই সবচেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে,
যখন নিজের দুঃখকে আর্তনাদ না বানিয়ে সহমর্মিতায়
কারও নিরাময়-আশ্রয় হয়ে ওঠে। আর এমন মানুষই তো
মুষড়ে পড়া মানুষদের নতুন আশার আলোয় পথ দেখায়।
