৪০ ঊর্ধ্ব নারী

শম্পা মহান্তি (কলকাতা)

একজন ৪০ ঊর্ধ্ব নারীকে বোঝা কি এতোটাই সহজলভ্য ? তার উপরে সেই নারী যদি ভীষণভাবে আত্ম বিশ্বাসী, আত্ম সম্মানী, প্রতিষ্ঠিত হন তাকে বোঝা কি সত্যিই সহজলভ্য ?
মিমি বলেই বসলো কফির কাপে চুমুক দিয়ে, মৈনাক দুনিয়াদারি আর পেশাদারী প্রেম ওই কফির কাপের মতোই পরিধির রেশ শোস্যাল মিডিয়া থেকে,কাজের জায়গায়তেও বিস্তৃত। আসলে বহু মানুষের জীবন থেকে সন্তুষ্টি হারিয়ে গেছে। নইলে এক ঘরে থেকেও যত বেশি হাতের নীলসাদা যন্ত্রটির ব্যবহার হয় ততোধিক কি ঘরের মানুষদের সাথে যত্নশীল হয় তারা ?
যদি হতেন তাহলে এক ছাদের তলায় থেকেও মানুষে মানুষে এতো দূরত্ব তৈরি হয় কি করে। যে প্রেমে একসময়ে আবেগের বন্যা বয়ে যেতো তাতে আবেগের বন্টন হয় কি করে মান আর হুঁশে?
বুঝলি মৈনাক তুই আর আমায় এই সব বিষয়ে দেখনদারি করে বক্তব্য রাখিস না। এর থেকে কফির গন্ধ স্বাদ উপভোগ কর। সে আপাতত তার উপস্থিতির গভীরতা স্বস্তি দেবে।

সেদিন ফেরার পথে ওই তো অটোর পেছনের সিটে ওই যে ৩৫ ঊর্ধ্ব মেয়েটিকে দেখলাম। সে তার ফোনে বাক্যবাণে বিধ্বস্থ করছিলো কাউকে। দুচোখ ছল ছল করছে। সাত বছরের মেয়ে আছে ওর। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি করে। মাসের প্রথমে মাইনে পেলেই তার ৮০% ওর স্বামী নিয়ে নেয়। ফিরছে কোর্টের এজলাস থেকে। সেপারেশনের কেস চলছে। আমি কি করে জানলাম তাহলে শোন। ওর দুই চোখের যন্ত্রণা ওর মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য আমায় ওই কিছু সময়ের জন্যে মায়াতে ফেলে ছিলো। নিজেই পরিচয় দিলাম নিজেই বললাম,’তুমি কি সুন্দরী গো।তোমাকে তুমি করেই বলছি ভাই।কেন এতো কষ্ট রাস্তাঘাটে বলছো। সব তো শোনা যাচ্ছে। লোকজনেরা তো তোমার রূপের ভোগ বিলাসী হবে গো। তোমাকে ব্যবহার করতে চাইবে। কি হয়েছে বলতে পারো আমায়।’ আমি একজন ৪০ ঊর্ধ্ব নারী। সে অকপটে বলে গেলো আমার মতো এক অপরিচিত নারীর কাছে তার হাজারো যন্ত্রণা। বলে গেলো প্রেম করে করা বিয়ে তারপরে শ্বশুরবাড়ীর যন্ত্রণা। এক ছাদের মধ্যে থেকেও চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়ার কথা। আমি হা করে সব শুনে গেলাম। ওর সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকলাম এমন সুন্দরী মেয়েরও এমন হয়। ওকে বলে ছিলাম,’তোমার বয়স কতো বললো ৩৫,’….ও ; জানো দিদিভাই আমার খুব কষ্ট হচ্ছে সই করতে। ভালোবেসে বিয়ে তো। তোমাকে চিনি না জানি না। তবুও তোমাকে যে ভালো লাগলো। তোমার ফোন নাম্বার দেবে গো। হ্যাঁ নিশ্চিত দেবো।
মৈনাক কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,’তারপরে ?’…..তারপরে আর কি ফোন নাম্বার দেওয়া নেওয়া হলো ৩৫ আর ৪০ এর মধ্যে। বলেছিলাম তোমার এতো রূপ,নিজেকে আরো দামী করে গড়ে তোলো ভাই। হারিয়ে যেও না এই কষ্টের সময়ে।

সংসারে রাখা গেরস্থ ঘরে ডানলোপিলোর গদির জানালায় পর্দা ঝুলিয়ে স্বর্গলাভ সে তো পর্দা ফিকে হয়ে গেলেই পাল্টানোর মতোই হয়ে যাচ্ছে। ওই তো অমৃতার বিয়েতে অতো খরচ করে ফার্নিচার দেবে ভেবেছিলেন ওর মা কিন্তু শেষপর্যন্ত সেসব না দিয়ে মেয়ের নামে সব ব্যাঙ্কে টাকা রাখলেন কাকীমা।
কয়েক বছর গেলো,অমৃতার মুখের হাসি চওড়া থাকলো না। তবে হতাশার কথাও খুব বেশি বলতো না। কয়েক মাস পরে মায়ের কাছেই ফেরত এলো স্বামীর ঘর ছেড়ে। সে আবার এতোটাই সেল্ফ – মেড ম্যান যে তার ঘরে বাইরে সঙ্গিনীর অভাব ছিলো না।
বুঝলে পীনল।
তুমি এই রাস্তায় যত গুলো মেয়েদের দেখচ্ছো তাদের এক একটা গল্প আছে। পুরুষেরও আছে। এই ভাঙ্গা গড়ার সংসারে পুরুষেরা কোন না কোনো নারীর সঙ্গ পায় বলেই পীনল তোমাকেও এজলাসে যেতে হয়। মন খারাপের চেপে রাখা রাগ, বিদ্বেষের কথা রাস্তাঘাটে ফোনেও প্রকাশিত হচ্ছে।

আমার এতোক্ষণের মেয়েলি বক্তব্য মৈনাক ধৈর্য্য নিয়ে চুপ চাপ শুনে যাচ্ছিলো। তারপরে আমার হুঁশ হতেই, মুখ থেকে সরি এলো,আমি ভীষণ কথা বলি রে। তোর কথাগুলো শোনা হলো না আর দেখ তুই এতোটাই ধৈর্য্য ধরে শুনে গেলি আমার কথা। কি করে পারিস রে।

মৈনাক একটু মুচকি হেসে বলে ফেললো,’পুরুষের যন্ত্রণা বলতে নেই দেখাতে নেই। আর ৪০ ঊর্ধ্ব নারীকে দুনিয়াদারি শেখাতে নেই।’

তারা বহু কিছু শিখে যায় পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, কাজ থেকে। আসলে কি জানিস তো,তুই আমি ওই কফির কাপের মতোই একটু তেতো,একটু কড়া,আমাদের আর মিথ্যে অভিনয় আসে না। তাই আমাদের উপস্থিতি বিস্তৃতি কাউকে স্বস্তি দেয়, আবার কারোর মাথা যন্ত্রণায় শান্তি দেয়, কেউ আবার কফি খেলে ঘুম হবে না কফি খাই না বলেই কফি শপে যায় না।
নেমপ্লেটের নাম বদলের মতোই ৩০ থেকে ৪০ হলো সেই সময়,রিসার্চ টেবিলে রাখা খাতা,……যাকে যার যতটুকু দরকার পড়ে তার নামকরণ মানুষ তেমনিভাবে রাখে !

CATEGORIES

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus ( )