আশ্রয়

পার্থ প্রতিম চ্যাটার্জী (হলদিয়া)

বিশিষ্ট সমাজসেবী অকৃতদার শুভঙ্কর বাবুর বিভিন্ন দিকে ব্যস্ততার শেষ নেই। শরীরের পৌঢ়ত্বের ছাপ পড়লেও। মনের টানে আর ইচ্ছেশক্তির জোরে রাজ্যের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে অবিরাম ছুটে বেড়ান শুধুমাত্র মানুষের জন্য কাজ করার টানে। কিন্তু যেখানেই থাকেন মন তার পড়ে থাকে তার তার প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধাশ্রম “আশ্রয়ে”। মাসে একবার হলেও ছুটে আসেন তার এই বৃদ্ধাশ্রমে। আবাসিকরা তার বৃদ্ধাশ্রমে সবদিক দিয়ে পরম শান্তির আশ্রয়ে দিন কাটান।
তার সমাজসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বিশেষ পুরস্কার নিয়ে, বহুদিন পরে আশ্রয়ে ফিরলেন।

 প্রতিবারের মতো শুভঙ্কর বাবু আসার কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে গেলেন সব আবাসিক দের খোঁজ খবর নিতে। সাথে আশ্রয়ের ম্যানেজার ও অন্য কর্মীরা। তার পুরস্কার প্রাপ্তির খবরে সমস্ত আবাসিকরাও অত্যন্ত আনন্দিত। তাকে দেখেই সকলে ভিড় করে দাঁড়ালেন তাকে ঘিরে। তার বৃদ্ধাশ্রম বিভিন্ন ফুল আর ফলের গাছের ঘেরাটোপে ঠিক যেন ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়। 

    সবার কুশল সংবাদ নিয়ে এগিয়ে গেলেন সবার থাকার ঘর পরিদর্শনে। হঠাৎ দেখলেন একটি ঘরের ভিতর জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। মাথায় তার পাকা চুল, গায়ের চামড়াও কুঁচকে এসেছে। বৃদ্ধা তার বৃদ্ধাশ্রমের ফুলের বাগানের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। শুভঙ্কর বাবু তার কর্মচারীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন উনি কে? আগে তো এখানে দেখিনি। কর্মচারীরা উত্তরে বললেন উনি  সাতদিন হলো এখানে এসেছেন। নাম শ্রাবণী অধিকারী। একমাত্র ছেলে ডাক্তার হয়ে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত, আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো স্বামী গত হয়েছেন। 

   তার ছেলে এসে রেখে গেছেন আমাদের আশ্রয়ে। কিন্ত ভদ্রমহিলা গাছ ফুল খুব ভালোবাসেন। উনি আসার পর নিজেই বলেছেন, উনি এইসব গাছ গুলিকে নিয়েই কাটিয়ে দিতে চান। 

 শুভঙ্কর বাবু তার কর্মচারী ও  অন্য আবাসিক দের বললেন ওনাকে সকলে মিলে আপন করে নিন। যেন পরিবার পরিজন দের অভাব কোনোদিন বুঝতে না পারেন। এই বলে শুভঙ্কর বাবু অন্য দিক গুলি পরিদর্শনে চলে গেলেন।

 এদিকে আশ্রয়ের কর্মচারী আর আবাসিকরা মিলে শুভঙ্কর বাবুর পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাকে অভিনন্দিত করবার জন্য সন্ধ্যায় একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। ইতিমধ্যে তারজন্য অনেক উপহার কেনা হয়েছে, সুন্দর ভাষায় একটি মানপত্রও বানানো হয়েছে। সব আয়োজন শেষ প্রায়। তখন একজন আবাসিক হঠাৎ বলে উঠলেন, শুভঙ্কর বাবুর এই প্রাপ্তিতে আমরাও গর্বিত। আমরা তাকে একটি মালা পরিয়ে বরণ করলে কেমন হয়। সবাই সম্মতি দিলেন, আর বললেন আমাদের বাগানের ফুল দিয়েই গাঁথা হোক মালা। 

 শ্রাবণী দেবী সব দূর থেকে দেখছিলেন নীরবে। তখন আশ্রয়ের ম্যানেজার এই অনুষ্ঠানে তাকে যুক্ত করে নেওয়ার জন্য বললেন, এই মালা গাঁথার দায়িত্ব শ্রাবণী দেবীকেই দেওয়া হোক। শ্রাবণী দেবী আপত্তি জানালেও, সবার জোরাজোরিতে রাজি হয়ে গেলেন। বিভিন্ন ধরণের ফুল তুলে আবাসিকরা অফিসে নিয়ে এলেন। শ্রাবণী দেবীর অফিসে ডাক পড়লো মালা গাঁথার জন্য। একটি টেবিলে ফুল গুলি রেখে চেয়ারে বসে আপন মনে মালা গাঁথছেন শ্রাবণী দেবী। এমন সময় অফিসে ঢুকলেন শুভঙ্কর বাবু। হঠাৎ শ্রাবণী দেবীর মুখে চোখ পড়তেই চমকে উঠলেন। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ভাবলেন ভুল দেখছিনা তো কিছু? মনে মনে বললেন এতো সেই তার সবচেয়ে প্ৰিয় মুখ। মুখের চামড়া কুঁচকে গেলেও, সেই চোখ সেই ঠোঁট। আর নামটাও এক। দূর থেকে দেখতে থাকলেন অপার বিস্ময়ে। তৎক্ষণাৎ যেন ফিরে গেলেন সেই যুবক বয়সে।        

     একসময় এই শ্রাবণীর সাথেই ভেসে গিয়েছিলেন প্রেমের বন্যায়। প্রায় সাত বছরের সম্পর্ক ছিলো তাঁদের। দুজনে দুজনার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলো কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। মানসিক শারীরিক সবরকম ভাবে তারা এক হয়ে গিয়েছিলেন। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না। শুভঙ্কর বাবু তখন বেকার। একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। কিভাবে একটা চাকরি পেয়ে শ্রাবণীকে সুখে রাখবে সেই চিন্তায় বিভোর। কিন্তু একটার পর একটা পরীক্ষা দিলেও চাকরি পাওয়া আর হয়ে উঠছে না তার। এইরকম করেই চলছিল তাঁদের জীবন। দুবাড়িতেও সবাই জানতো তাঁদের সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্ক সাত বছর চললেও হঠাৎ শ্রাবণীর মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করলো শুভঙ্কর। তার চেনা শ্রাবণী কেমন যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। তার মধ্যে সেই আকুলতা টান দিনে দিনে কমে আসছে। একে বেকারত্বের যন্ত্রণা তার উপরে শ্রাবণীর হঠাৎ বদলে যাওয়া। শুভঙ্করকে যেন পাগল করে তুললো। তারপর হঠাৎ এলো সেই রাত, বাইরে তুমুল ঝড় বৃষ্টি বজ্রপাত চলছে। ঘরের ভিতরে কারেন্টও নেই। অন্ধকারে জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলো শুভঙ্কর। টেবিলের উপরে রাখা ল্যান্ডফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো।  ফোনের রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই, শুনতে পেলো পেলো শ্রাবণীর অন্যরকম গলা। হঠাৎ করেই শ্রাবণী বলে উঠলো, আমি আর তোমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাইনা। আমার বাবা মা এক সরকারি স্কুলের শিক্ষকের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আজকে থেকে তুমি তোমার মতো থাকো আমি আমার মতো। 

বাইরের বজ্রপাতের চেয়েও তীব্র আঘাত যেন নেমে এলো শুভঙ্করের জীবনে। আকস্মিক অনভিপ্রেত আঘাতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো শুভঙ্কর। তারপরই ফোন কেটে দিলো শ্রাবণী। তারপর থেকে অনেক দিন ধরে ফোন করার চেষ্টা করলো যোগাযোগ করার চেষ্টা করলো, সবেতেই বিফল হলো সে। ছুটে গেলো শ্রাবণীর বাড়ি, শ্রাবণীর বাবা মা তাকে তীব্র ভাষায় অপমান করলেন।। ভয় দেখালেন,তার নামে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল এর কেস করবেন। এই ধাক্কায় পাগল হয়ে গেলো শুভঙ্কর। তারপর বিভিন্ন বন্ধু দের চেষ্টায় চিকিৎসা করে সুস্থ হলো কিছুটা। কিন্তু জেদ আরো চেপে বসলো। মনে মনে শ্রাবণীকে বললো, আমি তোমায় কথা দিয়েছিলাম তোমায় ছাড়া কাউকে বিয়ে করবনা, আর চাকরি জোগাড় করবোই। অবশেষে জুটে গেলো সরকারি চাকরি। অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকলো। শুভঙ্কর নিজেকে মনে মনে বললেন, মনে মনে তো বিয়ে করেছি শ্রাবণীকে। তাই এ জীবনে আর বিয়ে নয়। বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো মানুষের সেবায়।

  এক কর্মচারী দেখতে পেয়ে বললেন, একি স্যার আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? কর্মচারীর আওয়াজে সম্বিৎ ফিরলো শুভঙ্কর বাবুর আর শ্রাবণী দেবীর দুজনেরই । 

   এই প্রথম দেখলেন শ্রাবণী দেবী শুভঙ্কর বাবু কে। শ্রাবণী দেবীও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কি বলবেন কি করবেন বুঝতে পারছেন না। হাত থেকে পড়ে গেলে সদ্য সমাপ্ত হওয়া মালা টি। দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপতে লাগলেন। এই দেখে কর্মচারী শ্রাবণী দেবীকে ধরলেন। শুভঙ্কর বাবু ভাবলেন বিধাতার একি লীলা। শুভঙ্কর বাবু এগিয়ে গেলেন শ্রাবণী দেবীর দিকে, তার হাত ধরে চেয়ারে বসালেন, আর কর্মচারীকে বললেন বাইরে যেতে।

    তারপর শ্রাবণীর হাত ধরে বললেন, কেমন আছো শ্রাবণী? শ্রাবণী নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলেন। শুভঙ্কর বাবু বললেন, শ্রাবণী দেখো বিধাতার একি খেলা? দুজনকে জীবনের দুপ্রান্ত থেকে ছিঁড়ে এনে এক পথে আবার চালান করে দিলেন। বিধির বিধানের কাছে আর সত্যি কারের ভালোবাসর কাছে হেরে যায় সবকিছুই। বাকি জীবনটা তুমি এই আশ্রয়েই কাটিও, শেষ বয়সে হলেও আমার আশ্রয়ে তোমায় ভালো রাখার দায়িত্ব টুকু দিও। একদিন তোমার জন্মদিনে মায়ের পুজো দিয়ে তোমার কপালে পরিয়েছিলাম সিঁদুর। তাই আমি এখনো আর বিয়ে করিনি। আজকে তুমি যে মালা গেঁথেছো, আজকে সন্ধ্যায় সেই মালা দিও আমার গলায় তোমার ওই দুহাতে।

তারপর শ্রাবণী দেবীর পায়ের নিচে বসে, তার হাতদুটি ধরে বললেন ---

আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে….

শ্রাবণী দেবীর দুচোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়লো চোখের জল, দুজনের ধরে থাকা হাতে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *