মা

সোমা নায়ক (কলকাতা)

মা জানো, এখন না আমিও ঠিক তোমার মতোই বটবৃক্ষ হওয়ার চেষ্টা করি। আশ্রয় হয়ে আগলে রাখি আমার সংসার, সন্তান, ভালোবাসার লক্ষ নিযুত কারণ। তোমার মতোই নিজের আগে অন্যদের এগিয়ে রাখি। অন্যের ভালোমন্দের খবর রাখি। ওদের পছন্দ অপছন্দকে মাথায় রেখে কাজের ফিরিস্তি বানাই। আর করবো নাই বা কেন বলো। ওরাই যে আমার আপন, আমার জীবনের বিন্দু, বৃত্ত, উৎস।

সংসারের প্রয়োজনে এখন আমিও ঠিক তোমার মতোই হাসতে হাসতে মিথ্যে বলতে পারি, কাশতে কাশতে দম সামলে কিচ্ছু হয়নি বলতে পারি, ভাসতে ভাসতে ভালো আছিও বলতে পারি খুব সহজেই। সামান্য একটা ডিম ভাজতে গিয়েও গরম প্যানে ছ্যাঁকা খেয়ে বাড়ি মাথায় করা মেয়েটা এখন ফোস্কা, ফোঁড়া বা ফ্রাই, সবকিছুকে কেমন অগ্রাহ্য করতে শিখে গেছে অনায়াসে।

জানো মা, এখন আমিও ঠিক তোমার মতোই খানিক বোধবুদ্ধিহীন হয়ে জীবনকে অনেকটা সহজ বানিয়ে নিয়েছি সাগ্রহে। কারণ তোমার মতোই আমিও তো এখন নিজের খিদে তেষ্টার বোধের গোড়ায় অবহেলা ঢেলে দিই হেসে। অথচ বাকি সবার দিকে তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখি রোজ। কে কী চায় ভেবে নির্ঘুম চোখের নিচে কাজলহীন মার্কারে চিরন্তন দাগ টেনে রাখি। সবার জন্য যত্নের খাবার বানানোর সময় ভুলে যাই, অনেক অনেক বছর আগে তোমার সেই আহ্লাদী মেয়েটার ঠিক কি কি খেতে ভালো লাগত। ভুলে যাই আবদার করে কিছু চেয়ে হাপিত্যেশ অপেক্ষায় থাকা মেয়েটা খানিক অবুঝও ছিল বোধহয়। এখন অবশ্য আমি সমঝদার-এর তকমা পেয়েই খুশি। তোমার মতো, ঠিক তোমার মতো। তাই না মা?

জানো তো মা, আমিও ঠিক তোমার মতোই অনেক বড়ো বড়ো ব্যাপার ভুলে যেতে পারি সহজে। আবার অনেক তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে আমার দৃষ্টিশক্তি কি ভীষণ প্রখর। এই যেমন সংসারের তেল নুনের হিসেব রাখতে রাখতে আমি বেমালুম ভুলে গেছি একটা সময় প্রতিদিন গলা না সাধলে আমার কষ্ট হতো খুব। আর এখন সেই কষ্টটা হয় যখন আপনজনদের কোন ইচ্ছে পূরণে অপারগ হই। মা আমি কেন ঠিক তোমার মতোই হলাম জানি না। তবে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, এমনটাও হয় বুঝি! আচ্ছা, অন্যদের ক্ষেত্রেও কি ঘটে?

মা জানো, অতীত বিলাসে খুব বেশি সময় সুযোগ তো পাই না, হয়তো ইচ্ছেও করে না তেমন তবু যখন ফেলে আসা সময়ের দিকে মাঝে মাঝে ফিরে তাকাই তখন দেখতে পাই, উঠোনের ঠিক শেষ প্রান্তে, ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে, অপেক্ষাতে দাঁড়িয়ে আছো তুমি। আর এখন, আমিও ঠিক তোমার মতোই দাঁড়িয়ে থাকি একা, জীবনের সমস্ত রোদ ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করি। কি আশ্চর্য! মায়েদের অপেক্ষা কখনো ফুরোয় না, তাই না মা!

কত কীই তো বলতে ইচ্ছে করছে অথচ গুছিয়ে তেমন বলতে পারছি কই। শব্দের অভাব নাকি সহজতার ? জানি না। তবে নিশ্চিত ভাবে জানি যে আমার জীবনে তুমি হলে সেই রং যা দিয়ে একটা শূন্য ক্যানভাস রঙিন হয়ে ওঠে। সেই আলো, যে আলোয় একটা অন্ধকার রাত ধীরে ধীরে দিন হয়ে ওঠে, নতুন সকালের মতো প্রস্ফূটিত হয় পৃথিবীর কাছে। জীবনের পথ দুর্গম হোক বা সুগম, সুখের পাল্লা ভারী হোক বা হাল্কা, দুঃখের দিন দীর্ঘ হোক স্বল্পায়ু, অভিমানী চোখ টলটল হোক বা শুষ্ক, হাসতে হাসতে, ভাসতে ভাসতে ভাবি, ভাগ্যিস আমার মা আছে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *