সুমিতা সিনহা (দুর্গাপুর)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “গল্পগুচ্ছ”কে বুকের মাঝে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। শেষ বিকেলের আলোয় একদা প্রাপ্ত যে সুখ আমার বেলাভূমিতে আছড়ে পড়েছিল,সেটাই আজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের চোরাপথে। মনে হচ্ছে যেন অন্ধকার ঘর থেকে আলোর শিখা দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। বাক্ রহিত আমি পথ পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চেতনা ফিরে পেলাম। সেই কিশোরী বেলার দিনগুলোতে আর কেউ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।
আমি শাপলা। হ্যাঁ বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিল শাপলা। দারিদ্র্যতার দিঘিতে ডুবে থাকা পরিবারে ফুল হয়ে জন্মেছিলাম। তাই বুঝি ওই নাম। ভাসমান জীবনে চোদ্দ বছরের সুখধূলো ঝেড়ে বয়সে দ্বিগুণ এক পুরুষের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এলাম তার ঘরকন্না করতে। জাগতিক কোনো ভোগ্যপণ্যের অভাব না থাকলেও রাতে বিছানায় বরের স্বামীত্ব আর সংসার চক্রে আবর্তিত হতে হতে একসময় হারিয়ে গেলাম বিনা প্রতিরোধে। ফলস্বরূপ এক কন্যা সন্তানের জননী। এখন মেয়ের বয়স চোদ্দ। ঠিক যে বয়সে এসে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। মাধ্যমিক দেবে মেয়ে আর কিছুদিন পরেই। তাই গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে এলো সে।
প্রথমদিনের আলাপচারিতায় জেনেছিলাম ভালোবাসে কবিতা লিখতে। ভালোবাসে রবিঠাকুরের গান গাইতে। শুনেই বুকের ভিতর জমে থাকা আঁচড়গুলো আবারও একবার ক্ষত বিক্ষত হতে লাগলো।শারীরিক উচ্চতা কম হলেও অস্তিত্বের গভীরতা যে অনেক বেশি তার পরিচয় প্রথম দিনেই টের পেলাম। ইচ্ছে হলো আবারও সেই শেষ থেকে শুরু করতে। মনের কথাটুকু জানতে পেরে এনে দিল একখানি লাল রঙের ছোট্ট ডাইরি।
‘আমি নিয়ে কি করবো? সে সব কি আর মনে আছে? বিদ্যেবুদ্ধির পরিসর তো সেই কোন কালেই চুকেবুকে গেছে।’ অসম্ভব সাধনের প্রত্যয়ে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে বলে ‘লিখুন আমি পড়ব! এক লাইন দুই লাইন যা হোক।’ বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে লাল ডাইরিটার গন্ধ শুঁকেছিলাম দীর্ঘ সময় ধরে। এটা আমার কাছে শুধু লাল ডাইরি নয় এটা একটা জাদু আয়না। যখনই আয়না খুলে বসতাম তখনই নানান রঙে রঙিন হয়ে উঠত আমার স্বপ্নগুলো। ভাষা হয়তো সেই এইট পাশ মেয়ের মতোই তবুও কথার ফুলঝুরিতে সেজে উঠতে থাকে ছোট্ট ডাইরির পাতাগুলি।
আমারও যে নিজস্ব একটা অস্তিত্ব আছে! তার শিরায় শিরায় কত শত সূক্ষ্ম অনুভূতি বাসা বাঁধতে পারে–এ আমার ধারণার বাইরে ছিল। এখন একাকীত্বের সময়গুলো আর অলস লাগে না। অনেক না দেখা স্বপ্ন আবারও নতুন করে দেখি। প্রত্যহ ভেসে বেড়াই স্বপ্নের জগতে। যে জগতের প্রতিটি ঘটনা,চরিত্রের রচয়িতা আমি স্বয়ং।
তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! শেষ বিকেলের আলোয় নতুন পোশাক পড়ে হাতে রবীন্দ্রনাথের “গল্পগুচ্ছ” নিয়ে হাজির। “গল্পগুচ্ছ” আমার হাতে তুলে দিয়ে এক অজানা আশংকার ঢেউ সত্যি করে বলল ‘আমি চলে যাচ্ছি ওড়িশা। পোস্টমাস্টারের চাকরি হয়েছে।’
একচিলতে রোদ্দুরে উড়তে থাকা বোতলবন্দি রঙিন প্রজাপতিরা আবারও ফিরতে লাগলো সেই পুরাতন আশ্রয়ে ।।
