রুধিরাক্ত

শম্পা মহান্তি (কলকাতা)

ছোটবেলায় আফ্রিকার জঙ্গল থেকে সুন্দরবনের জঙ্গল পড়েছি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’-এর কথাতো সকলেই জানি। সেই থেকে জঙ্গলের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি এক অদ্ভুত প্রেম মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন বনদপ্তরে চাকরি করি। ট্রান্সফার হতে হয় মাঝেমধ্যে।

যারা কাজ পাগল মানুষ, ঘর-সংসারে সময় দিতে পারে না, তাদের গার্হস্থ্যধর্ম পালন করা উচিত নয়, তাদের বাণপ্রস্থে যাওয়া উচিত – খুব জোরে জোরে তৃষা বলতে লাগল মৈনাককে। এতো অনেক ভদ্র কথার ঝগড়া। এর মধ্যে দুজনের মুখোমুখি গালাগালিও চলে। সেসব আমি পাশের ফ্ল্যাটের জানালা দিয়েও শুনতে পাই। কিন্তু ওসব এখানে বলতে পারা যাবেনা। তার মধ্যে বাসন-কোসনের দুমদাম আওয়াজও পাওয়া যায় ।

মৈনাক ব্যাঙ্কে চাকরি করে। তৃষা একটা প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি করতো। কিন্তু ওদের ঘরে মিনু আসার পরে তৃষা চাকরি ছাড়ে, মেয়েকে মানুষ করবে বলে। তারপরে মাঝেমধ্যে চলে ওদের ওসব ঠোকাঠুকি। আমার এসব দেখে শুনে মন থেকে বিয়ে করার প্রতি অনীহা এসে গেছে। তাছাড়া কল্যাণী আমাকে ছেড়ে বিয়ে করল পরেশকে। আমাদের ১০ বছরের সম্পর্কের ইতি ঘটলো।

 আগে মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে কল্যাণীর ভিজে কেশ রাশির মধ্যে ভেজা নরম গোলাপী ঠোঁট আসতো আমার মুখের কাছাকাছি। সেথায় চলতো নানারকম গোপনীয়তার রোমান্স। এখন ঘুমের মধ্যে হাতি আসে। তাদের কেউ জঙ্গলে হামলা করল, কেউবা কোন গর্তে পড়লো, কেউ রাস্তায় চলে গেল- এইসব আরকি!

রোজ পশুপাখিদের বাসর ঘর থেকে তাদের সংসার, সেবা সুশ্রূষা মাথার মধ্যে আসে আর যায়। তার মাঝেই রাতে ল্যাপটপে নানাবিধ মেল দেখা। কফির বুনো পোড়া গন্ধের কাপে চুমুক মেরে কাজে ডুবে যাওয়া, ফের সকালে বিছানায় নিজেকে এলোমেলো ভাবে ঘুম থেকে তোলা। এমন জীবন কি অন্যের বাড়ির মেয়ে এসে সামলাবে! আমারও রাতদিন ওই মৈনাকের মতন অবস্থা হবে। তার চেয়ে আমার বনদপ্তর ভালো।

আজ রোববার।…..অন্যান্য দিনের মতো আজও দক্ষিণের জানালা টানতে যাব। ঘুমের আগে পাশের ফ্ল্যাটে আজ কোন হল্লা শুনতে পেলাম না। কিছুটা অস্বাভাবিক লাগল। আমারও কেমন মেয়েলি স্বভাব হয়ে গেছে, ঠিক আমার বাড়ির কাজের মাসির মত। এটা ভেবে নিজের মনেই হাসলাম। জানলাটা টেনে কফি বানিয়ে মেইল চেক করব দেখি টুং করে একটা মেইল ঢুকলো। জলদাপাড়া সংলগ্ন জঙ্গলে ট্রান্সফার এসেছে। সামনের মাসেই আবার সেথায় যেতে হবে পাততাড়ি গুটিয়ে। পরের দিন অফিসের এক বিশ্বস্ত সূত্র মারফত জানলাম- যেখানে ট্রান্সফার হয়েছে সেখানে কোন হাতির হাতাহাতি কেস বা রক্ষণাবেক্ষণ এর বিষয় নয়। হঠাৎ করে বনদপ্তরের একটা পোস্ট খালি হওয়াতে সেখানে আমার ট্রান্সফার।

জঙ্গল সংলগ্ন তিস্তার সুবিশাল ব্রিজের কাছাকাছি শাল, জারুল, সেগুন, চাপ, চিলৌনি, চিপরাশি গাছের রাজত্বের মধ্যে পাওয়া গেছে পাঁচ পর্যটকের মৃতদেহ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মৃত্যুর কারণ হলো রক্তশূন্যতা। ছয় নম্বর দেহ হলো বনদপ্তরের এক কর্মীর। তবে দেহগুলির আশেপাশে বা তাদের শরীরে পাওয়া যায় নি কোন রক্তক্ষরণের চিহ্ন বা রক্তের ছাপ।

CATEGORIES

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus ( )