
হেডমাস্টার কে নিয়ে অভিযোগের পাহাড়, এত কিছুর পরেও উদাসীন প্রশাসন !! প্রতিবাদ করে কাল ঘাম ছুটেছে অভিভাবক মহলে
রাকেশ লাহা, জামুড়িয়া, পশ্চিম বর্ধমান:-
চাল বিক্রির অভিযোগের পর এবার মিড ডে মিলে গড়মিলের অভিযোগ। হেডমাস্টারের অসাধু ক্রিয়া-কলাপে সরব অভিভাবকরা।
অভিযোগের তীর যেন কোনো মতেই পিছু ছাড়ছে বেলডাঙ্গা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রামপ্রসাদ মুহুরীকে। বিদ্যালয়ের নেশা দ্রব্য সেবন করে মাতলামি করা থেকে শুরু করে পড়ুয়াদের অভিভাবকদের সাথে অশালীন আচরণ , পচা মাংস রান্না করা, এমন কি গত কয়েকদিন আগে চাল বিক্রির অভিযোগে গ্রামবাসীদের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ার পরেও প্রধান শিক্ষকের দুষ্কর্ম যেন এখনো চলছে জোর কদমে।
একাধিকবার শিক্ষক মহাশয়ের এহেন কর্মকান্ডের বিষয় নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিটি অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে এড়িয়ে যান, তবে এবারের বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য ফোন করা হলে ফোনে পাওয়া যায়নি ।
প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, জামুরিয়া শিক্ষা চক্র ২ এর অন্তর্গত বেলডাঙ্গা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩ জন শিক্ষক এবং ২জন শিক্ষিকার হস্তক্ষেপে শিশু শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতিতে বিদ্যালয় চলছিল আপন ছন্দে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ, সবমিলিয়ে এই বিদ্যালয় ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কারও পায়।
কিন্তু সেই ছন্দের পতন হয় তখনই, যখন বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে যোগদান করেন রামপ্রসাদ মুহুরী।
হেডমাস্টারের লাল চোখ এবং গুরু গম্ভীর স্বভাব পড়ুয়াদের মনে ভয়ের সঞ্চার ঘটায় এবং অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী বিদ্যালয়ে আসা প্রায় বন্ধই করে দেয়। তারপরই ঘটে একের পর এক সারা ফেলে দেওয়ার মতন ঘটনা। প্রথমত বিদ্যালয়ে নিত্যদিনই একমুখ গুটকা, পান এমনকি নেশা জাতীয় দ্রব্য পান করে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করত হেডমাস্টার, নেশার ঘোরে অভিভাবক এবং পড়ুয়াদের সাথে বহুবার অশালীন আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রায় । সেই কারণে তুমুল বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পড়ুয়াদের অভিভাবক, এমনকি বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকারাও।
সেই ঘটনার পর মীমাংসা বৈঠক হয় তারপর প্রধান শিক্ষক নিজের ভুল স্বীকার করে জানাই আগামী দিনে এরকম ঘটনা আর ঘটবে না।
ঠিক কিছুদিন পেরোতে না পেরোতেই আবার পচা মাংস রান্না করার অভিযোগ ওঠে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে, যার দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে পড়েন বিদ্যালয়ের একাধিক পড়ুয়া। সেই সময়ও প্রথম সারির একাধিক সংবাদ মাধ্যম এবং ডিজিটাল মিডিয়ায় বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেয় প্রশাসন।
পাশাপাশি স্থানীয় অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে সমাধান বৈঠক হয় এবং সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
কিন্তু প্রধান শিক্ষকের ভরসার কথা আর বিশ্বাসযোগ্য বলে মেনে নিতে পারেননি অভিভাবক মহল। আগামী দিনে আবারও কোন অসাধু কাজ করবে বলেই আগে থেকেই সেই আঁচ পেয়েছিলেন অভিভাবকদের একাংশ।
আর সেই ঘটনা যেন সত্যিই হলো। আরো একবার প্রধান শিক্ষকের অসাধু ক্রিয়াকলাপ সামনে এলো বিদ্যালয়ের মিড ডে মিলের চাল বিক্রির অভিযোগ কে কেন্দ্র করে।
প্রসঙ্গত ডিসেম্বরের ২৩ তারিখ ব্লক স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল সেদিন বিদ্যালয়ের পড়ুয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য শিক্ষকরা খেলার মাঠে উপস্থিত ছিলেন। সেই সময় নাকি প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের গোডাউন থেকে ৪ বস্তা চাল বের করে এক পণ্য ব্যবসায়ীকে বিক্রি করতে যাচ্ছিল। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে এবং তারা প্রধান শিক্ষককে হাতেনাতে ধরে তুমুল বিক্ষোভ দেখায়। ঠিক তার পরের দিন অর্থাৎ ২৪শে ডিসেম্বর আগে ভাগেই প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে এসে প্রতিটি ক্লাসরুম খুলে দেয় এবং রান্নার ঘরটিও খুলে বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যান অথচ চাল ডাল থেকে শুরু করে রান্নার আরো যাবতীয় সামগ্রী যে ঘরে রাখা থাকে সেই ঘরটি তালা বন্ধ করে দিয়ে চলে যায়, যার ফলস্বরূপ বিদ্যালয়ে বন্ধ হয়ে পড়ে মিড ডে মিল ব্যবস্থা।
সেই দিন বেলা বারোটা নাগাদ বিদ্যালয়ে পৌঁছায় চিচুড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান সোমনাথ চক্রবর্তী। তিনি দেখেন বিদ্যালয়ে বন্ধ মিড ডে মিল, খুদে পড়ুয়াদের কথা চিন্তা করে নিজেই কিছু টাকা দিয়ে পড়ুয়াদের জন্য শুকনো খাবার আনানোর ব্যবস্থাও করেন।
কিন্তু তারপরই অন্য এক বিষয় সামনে আসতেই, অভিভাবক থেকে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকার সকলেই হতবাক হয়ে পড়েন ।
২৪ তারিখ বিদ্যালয়ে পুরোপুরি বন্ধ ছিল মিড ডে মিল ব্যবস্থা, অথচ অভিযোগ প্রধান শিক্ষক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে ২৪ তারিখ বিদ্যালয়ে ৯২ জন পড়ুয়া দুপুরের খাবার খেয়েছে।
কিন্তু প্রধান শিক্ষক বাদে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দাবি বিদ্যালয়ে ২৪ তারিখ পড়ুয়া এসেছিল হাতেগোনা ১১ জন। যাদেরকে পঞ্চায়েতের উপপ্রধান শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করে দেয় কেননা বিদ্যালয়ের সেদিন মিড ডে মিল রান্নাই হয়নি।
তবুও প্রধান শিক্ষক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ৯৪জন ছাত্রছাত্রীর মিড ডে মিল রান্নার রিপোর্ট পাঠায়, সেই রিপোর্টও গ্রহণ করে নেই কর্তৃপক্ষ।
আর সেই বিষয়টি সামনে আসতে আরো একবার যজ্ঞে ঘি পড়ে। স্থানীয়রা দাবি করেন কর্তৃপক্ষ কেন বিষয়টি খতিয়ে না দেখে প্রধান শিক্ষকের দেওয়া রিপোর্ট হাতে তুলে নিল ?
এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই দাবি এত কিছু ঘটনার পরেও প্রশাসন কেন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ? তারা দাবি করেন এই হেডমাস্টার বিদ্যালয়ে থাকলে আমাদের ছেলে মেয়েরা বিদ্যালয়ে আসবে না, মিড ডে মিল খাবে না এমনকি আগামী দিনে অন্য বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করিয়ে নিতে বাধ্য হবো আমরা ।।
এখন দেখার প্রধান শিক্ষক কে নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে জামুরিয়ার বেলডাঙ্গা আদিবাসী বিদ্যালয়ে সেই সমস্যার সুরাহা কি আগামী দিনে মিলবে ? নাকি এভাবেই এক নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার প্রাপ্ত স্কুল শেষ পর্যন্ত রসাতলে যাবে ।।

