মা

সুজান মিঠি (পূর্ব বর্ধমান)

সরস্বতী বাগদি পুষ্পাঞ্জলি দিতে এসেছে।
তার কাঁধের নীচ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ভিজে চুল।
জল চোঁয়াচ্ছে।
পুরোহিতের ছিবড়ে মার্কা গলার স্বর,
বলি ও সরো, তোদের বাগদি পাড়ায় বুঝি আজ খুব কাজ ছিল?
একেবারে শেষে এলি যে বড়! নে নে ফুল নে…

ফুল দেওয়ার অছিলায় বুকের ভাঁজ ছুঁয়ে দেওয়া পুরোহিতের হাত মুচড়ে ধরলো সরস্বতী, থুক করে থুতু ছুঁড়ে মারলো পুরোহিতের মুখে। বাগদি পাড়ার থুতু হাত দিয়ে মুছে পুরোহিত চোয়াল শক্ত করলো, আচ্ছা! খুব দম রে মাগি…

সরস্বতী মায়ের চোখের দিকে তাকালো।
সবখানে মাটি। মা কই?
সরস্বতী ছুটে বেরিয়ে এলো।
মা খুঁজতে লাগলো।
জন্মের সময়ই তার নিজের মা ছেড়ে গেছে পৃথিবী।
তাচ্ছিল্য আর ঘৃণা নিয়ে এ ঘরে ও ঘরে আস্তাকুঁড় হয়ে বেড়ে উঠেছে সে।
ইস্কুলের পুজোয় পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ পাওয়ার ইচ্ছেয় এসেছিল।
তাকে খাবলে খুবলে খেতে চায় যে সব হাত
ও এমনি করেই তাদের মুচড়ে দেয়…
তাই তার আশেপাশে খুব একটা লালা গড়ায় না।

সরস্বতী নদীর ধারে এসে বসে। জলে নামে। সাঁতার কাটে। স্রোতের আল্পনায় শরীর ভাসিয়ে গুনগুন গান ধরে।

সরস্বতী ধান কাটে। মশলা বাঁটে। ফ্যান গড়ায়। আর সারা শরীরের বাগদি পাড়ার মুখে পুষে রাখে সাপ। কেউ ধরতে এলেই ফোঁস…

ঘুমের ঘোরে নোনা জল গড়ায় তার গালে। দাগ শুকোয়। তারপর একদিন ঘুম ভাঙে তার।
বিছানায় উঠে বসে সে খিলখিল করে হেসে ওঠে।
পেয়েছি! পেয়েছি! আমি মা পেয়েছি!

সরস্বতী ভাবে, সেই তো মা! সেই তো তার নিজের মা! সেই তো সে মায়ের মূর্তি! যে বাঁচায়, আগলে রাখে, ভালোবাসে সে মা হয়। সরস্বতীর শরীর মন বেঁধে রেখে আগলে রাখে সে নিজে। তাই সেই তার মা। নিজের মা।

মণ্ডপে মায়ের পুজো হচ্ছে। পুষ্পাঞ্জলি দিবি না? সরস্বতীর সাথীরা ডাকে। সরস্বতী পুজোর স্থানে ছুটে যায়। দেখে, শ্বেত শুভ্র দেবী জ্বলজ্বল করছে খড় মাটির কাঠামোয়।
সরস্বতী হাসে।
পুরোহিত ভক্তি ভরে পুজো করে। প্রণাম রাখে মূর্তির পায়ে…মায়ের পায়ে…

সেই তো সে মায়ের মূর্তি! মৃন্ময়ী।
পুরোহিতের মোচড়ানো হাত কাঁপে…
সরস্বতীকে দেখে দূর থেকে তার দিকে ফুল ছোঁড়ে, বলে, আর এমন হবে না মা… কাল স্বপ্নে দেখলুম তোকে… বীণাপাণি তুই আমার!

বাগদি পাড়ায় আলো জ্বলে ওঠে।
সরস্বতীর হাত ধরে কচি কাঁচা কাদা কাদা মুখগুলো ইস্কুলে যায়।

CATEGORIES

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus (0 )