দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা পুজো আজ অস্তাচলে!

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা পুজো আজ অস্তাচলে!

অঙ্কিতা চ্যাটার্জ্জী :-

        ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, আসাম প্রভৃতি পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে পালিত অন্যতম বিখ্যাত উৎসব হলো বিশ্বকর্মা পুজো। বলা হয় এই পুজোর হাত ধরে বাঙালির শ্রেষ্ঠ শারদীয় উৎসবের সূচনা।অন্যান্য পুজোগুলো সূর্যকে ভিত্তি করে তৈরি করা ক্যালেন্ডার অনুসারে হলেও এই পুজো চন্দ্রকে ভিত্তি করা ক্যালেন্ডার অনুসারে হয়৷ ওইদিন সূর্য সিংহ রাশিকে ত্যাগ করে কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে। যারজন্য দিনটি কন্যা সংক্রান্তি দিবস নামেও পরিচিত৷ প্রতি বছর একই দিনে সাধারণত ১৭ ই সেপ্টেম্বর এই পুজো হয়। শিল্পী, কারিগর এবং প্রযুক্তিবিদরা তাঁর আশীর্বাদ লাভ করার জন্য এই পূজা করে থাকেন। এইদিন তারা তাদের জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ যন্ত্রপাতি গুলির যত্ন করেন। কোথাও কোথাও এইদিন আকাশে রঙবেরঙের ঘুড়ির মেলা দেখা যায় যা শরতের আকাশকে আরও রঙিন করে তোলে।

       পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী স্বয়ম্ভু বিশ্বকর্মা হলেন দেবশিল্পী এবং মহাবিশ্বের স্থপতি ও সৃষ্টির দেবতা। কথিত আছে, বিশ্বকর্মা নিজ কন্যা সংজ্ঞার সাথে সুর্যের বিবাহ দেন। সুর্যের প্রখর তাপ সহ্য করতে না পেরে সংজ্ঞা সূর্যের তাপের এক অষ্টমাংশ কেটে ফেলেন। এই কর্তিত অংশ দিয়ে বিশ্বকর্মা ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিবের ত্রিশূল, কুবেরের অস্ত্র, কার্তিকেয়ের শক্তি সহ  অন্যান্য দেবতাদের অস্ত্রশস্ত্রা নির্মাণ করেন। শ্রীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ জগন্নাথদেবের মূর্তি স্বয়ং বিশ্বকর্মা তৈরি করেন। কৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা, লঙ্কানগরী এবং পাণ্ডবদের মায়াসভা তাঁরই সৃষ্টি। সাধারণ মানুষ তাঁকে কারিগরী দেবতা জ্ঞানে পুজো করেন। তারা বিশ্বাস করে যন্ত্রের প্রতি যত্ন করে বিশ্বকর্মার পুজো করলে সেই যন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী  হয় এবং প্রচুর শক্তি লাভ করে। 

       হিন্দুপুরাণ মতে বিশ্বকর্মা ছিলেন দেবশিল্পী। বিষ্ণুপুরাণ মতে প্রভাসের ঔরসে বৃহস্পতির ভগিনীর গর্ভে বিশ্বকর্মার জন্ম। বেদে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বকর্মা বলা হয়েছে। ঋগ্বেদ মতে ইনি হলেন সর্বদর্শী ভগবান। এঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পা সব দিকে ছড়িয়ে আছে। বাহু ও পায়ের সাহায্যে ইনি স্বর্গ, মর্ত্য ও লঙ্কাপুরী নির্মাণ করেন। 

রামের সেতুবন্ধন তৈরি করার জন্য নল-বানরকে সৃষ্টি করেন। 

      বাঙালি হিন্দুরা বিশ্বকর্মার চতুর্ভুজ মূর্তি রূপে পূজো করেন। এর এক হাতে আছে দাঁড়িপাল্লা এবং অন্য হাতে হাতুরি, ছেনি ও কুঠার। দাঁড়িপাল্লার দু’পাশে সমান ওজনের পাল্লা থাকে। একটি পাল্লায় বাটখারা রেখে অপরটিতে দ্রব্য রেখে পরিমাপ করা হয়। তাত্ত্বিক দিক দিয়ে বলা হয় দুই পাল্লার একদিকে থাকে জ্ঞান ও অপরদিকে কর্ম। জ্ঞানের দিকে পাল্লা বেশী ঝুঁকে পড়লে কর্মকে অবহেলা করা হয়। ফলে জীবনে নেমে আসে দুঃখ ও অভাব। আবার কর্মের দিকে বেশী ঝুঁকে পড়লে নেমে আসে আধ্যাত্মিক অকল্যাণ। তাই দু’য়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। 

      বিশ্বকর্মার বাহন হলো হাতি। কথিত আছে কলকাতার কর্মকার সম্প্রদায়ের প্রয়াথ হরষিত কেশরী রায় প্রথম হস্তী বাহনরূপী বিশ্বকর্মার পুজো করেন।  

        সাধারণত কলকারখানায় বিশ্বকর্মা পুজো হয়ে থাকলেও অতীতের সেই জৌলুস আজ আর দেখা যায়না৷ অধিকাংশ কলকারখানা আজ বন্ধ। কর্পোরেট সংস্কৃতির ছোঁয়ায় সেভাবে আজ আর  বিশ্বকর্মা পুজো হয়না। হয়তো একদিন বিশ্বকর্মা পুজো বন্ধ হয়ে যাবে।

CATEGORIES

COMMENTS

Wordpress (0)
Disqus ( )